নিজস্ব অনুসন্ধান
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই–এম) বিভাগ–৩ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ বাণিজ্যের ‘হটস্পট’ হিসেবে আলোচনায় থাকলেও, সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া ১০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, ভিডিওটি কোনো একক কর্মকর্তার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সংগঠিত দুর্নীতি কাঠামোর আভাস দিচ্ছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এক ঠিকাদার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবদুল খালেক আকনের সামনে নগদ ১০ লাখ টাকা রেখে বলছেন, “স্যার, ১০ লাখ চেয়েছিলেন, ১০ লাখই দিলাম।” এই দৃশ্য সামনে আসার পর থেকেই ই–এম বিভাগ–৩–এ টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল ছাড়, প্রকল্প অনুমোদন ও মালামাল মূল্যায়ন ঘিরে পুরোনো অভিযোগগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টিকে তারা ‘স্ট্যান্ডঅ্যালোন’ ঘটনা হিসেবে দেখছে না। সূত্রের ভাষায়, “শুধু ভিডিওতে দেখা ব্যক্তিকে নয়, এর পেছনে কোনো কাঠামোগত নেটওয়ার্ক আছে কি না—সেটিই এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
দুদক সূত্র আরও জানায়, ইতিপূর্বে জমা পড়া অভিযোগগুলো পুনরায় যাচাই করা হচ্ছে। ফাইল পর্যালোচনা, আর্থিক লেনদেনের গতিপথ অনুসরণ, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ও কাগজপত্রের সামঞ্জস্য পরীক্ষা—এই সবকিছুই তদন্তের অংশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী খালেক আকনের পেছনে থেকে পুরো ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতেন নির্বাহী প্রকৌশলী এস. এম. ময়নুল হক। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজের বিল ছাড়, প্রকল্প অনুমোদন এবং মালামালের মূল্য নির্ধারণে ঘুষের হার ও পদ্ধতি নির্ধারণে নির্বাহী পর্যায়ের ভূমিকা ছিল—এমন আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল।
তবে এস. এম. ময়নুল হক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ভিডিওতে যে অর্থ দেখা গেছে, তা পুরোনো মালামাল বিক্রির মূল্য। কিন্তু দুদক সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, “সরকারি মালামাল বিক্রির অর্থ নগদ গ্রহণের নিয়মগত বৈধতা আছে কি না—সেটিও যাচাইয়ের বিষয়।” সূত্রের মতে, ভিডিওর দৃশ্য ও ব্যাখ্যার মধ্যে অসংগতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, ই–এম বিভাগ–৩–এর সঙ্গে তেজগাঁও গণপূর্তের সিভিল বিভাগ–৩–এর মধ্যে একটি সমন্বিত ‘প্রভাব নেটওয়ার্ক’ কাজ করছে। এই প্রেক্ষাপটে বাপিডিপ্রকৌশলীর সভাপতি এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ রায়হান মিয়ার নামও আলোচনায় এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন,
“রায়হান মিয়ার আশীর্বাদ থাকলে নিয়ম, যোগ্যতা বা টেন্ডার—কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।”
দুদক সূত্র নিশ্চিত করেছে, রায়হান মিয়ার সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও যাচাইয়ের আওতায় এসেছে। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “আমি এই চক্রের সঙ্গে জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়।
একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত ঘুষ না দিলে কাজ পাওয়া যায় না, বিল আটকে থাকে বা নানা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হয়। কেউ কেউ দাবি করেছেন, কাজ না করেও বিল উত্তোলনের মতো অভিযোগও তদন্তকারীদের কাছে এসেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
“দুর্নীতিবাজরা যতই ক্ষমতাধর হোক, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, গণপূর্তের মতো সংস্থায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্নীতি থাকলে তা ভাঙতে স্বাধীন ও গভীর তদন্ত জরুরি।
এই ঘটনায় কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে—
দুদক সূত্র বলছে, তদন্ত এখনও চলমান। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা নেওয়ার প্রক্রিয়াও এর অংশ। তবে সংশ্লিষ্টদের নীরবতা তদন্তের প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করে তুলছে।
মন্তব্য করুন