নিজস্ব প্রতিবেদন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম (ইলেকট্রোমেকানিক্যাল) কারখানা বিভাগের সদ্য সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের করা এক লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, নামে-বেনামে বাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্সসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে এবং সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে আয়কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
দুদক সূত্র জানায়, ১৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে মো. ইউসুফের বিরুদ্ধে একটি বিস্তারিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। এর আগেই তার বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের এক অফিস আদেশে বলা হয়, দৈনিক পাঞ্জেরী ও সময়-এর আলো পত্রিকায় প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম কারখানা বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. ইউসুফের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে—
কমিশন ছাড়া কাজ না করা। নির্দিষ্ট ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগি। কাজ না করেই বিল উত্তোলন। বিল ছাড়ের জন্য ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ। এছাড়া অভিযোগকারীর দাবি, একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পে এক ঠিকাদারের বিল আটকে রেখে ৩৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়, যার কারণে প্রকল্প হস্তান্তরের দুই বছর পরও পুরো বিল পাননি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার।
সূত্র জানায়, ইএম কারখানা বিভাগকে দীর্ঘদিন ধরে একটি “লাভজনক পোস্টিং” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বিভাগে আসার জন্য মো. ইউসুফ বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেন এবং এখান থেকেই কমিশন বাণিজ্য পরিচালনা করতেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সখ্যতা রয়েছে। নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে এই সিন্ডিকেট নেপথ্যে প্রভাব বিস্তার করে বলেও দাবি করা হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি সিন্ডিকেটের এক সদস্যকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে, যেখানে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, মো. ইউসুফ একদিকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়ার সুবিধা নিয়েছেন, অন্যদিকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করতে ভুয়া প্যাড ও সিল ব্যবহার করে নিজেকে ছাত্র সংগঠনের নেতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় ওই প্যাড ও সিলের সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে একাধিক প্রকল্পের বিস্তারিত হিসাব তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে—
সংসদ সচিবালয় কর্মকর্তাদের জন্য ১১২ ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পে কোটি টাকার কাজের বিল জুন ক্লোজিংয়ে পরিশোধ হলেও বাস্তবে কাজ না হওয়ার অভিযোগ, জাতীয় আর্কাইভ ও লাইব্রেরি ভবন, স্থানীয় সরকার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, আবহাওয়া অধিদপ্তরসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ভুয়া কাজ দেখিয়ে অর্থ লোপাটের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে উপসহকারী প্রকৌশলীদের সহায়তায় বরাদ্দের টাকা ভাগাভাগি করা হয়েছে বলে দাবি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার উদয়ের পথকে বলেন,
বিল তুলতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন দিতে হতো। টাকা না দিলে ফাইল আটকে থাকত মাসের পর মাস।
আরেক ভুক্তভোগী বলেন,কাজ শেষ করেও পুরো বিল পাইনি। চাপের মুখে কিছু টাকা দিতে বাধ্য হয়েছি।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একজন বিশ্লেষক বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটভিত্তিক দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। স্বচ্ছ তদন্ত না হলে এই চক্র ভাঙা কঠিন।
তার মতে, বড় প্রকল্পে অনিয়ম হলে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জনস্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুদকের অবস্থান দুদক সূত্র জানায়, অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য যাচাই করা হলে অনেক অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যেতে পারে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন উঠছে,এতসব অভিযোগের পরও কেন এখনো চূড়ান্ত তদন্তের ফল প্রকাশ হয়নি? মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতদূর? দুদক কি এই অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছেন সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধান ও তদন্তের অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করবে, অভিযোগগুলো কতটা সত্য এবং শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।