নিজস্ব অনুসন্ধান
নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার সাবেক এক নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা বর্তমানে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে কাজ করছেন। যদিও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী আতিকুল ইসলাম (আতিক) সম্প্রতি কর্মকর্তা (ওএসডি) হয়েছেন, তবে হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক বা তদন্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সূত্র জানায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে হারুন অর রশিদকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা চলমান। অভিযোগ রয়েছে, সংস্কার কার্যক্রমের কথা বলা হলেও উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের নজর এড়িয়ে তাকে রাজশাহী থেকে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়ন করা হয়। নারায়ণগঞ্জে যোগদানের পর তিনি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, ঠিকাদারদের ওপর চাপ এবং অনিয়মের মাধ্যমে একটি সংগঠিত সিন্ডিকেটকে শক্তিশালী করেছেন—যা অনেক কর্মকর্তা ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে চললেও গণপূর্ত অধিদপ্তরে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার দীর্ঘদিন ধরে একটি পুরোনো আওয়ামীপন্থী নেটওয়ার্ক ধরে রেখেছিলেন। তার সময়েই হারুন অর রশিদকে রাজশাহী থেকে নারায়ণগঞ্জে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল, তাদেরই নতুন পরিচয়ে পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় শামীম আখতার টানা তিন বছর একই পদে বহাল ছিলেন। অনেক কর্মকর্তা আশা করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকার তার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু বাস্তবে ‘দক্ষতা’ ও ‘প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন’-এর যুক্তিতে তাকে সরানো হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের রদবদলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা ও ছাত্রসংগঠনের সাবেক নেতাদের পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠেছে। আতিকুল ইসলামের সিন্ডিকেটের সদস্যদের অপসারণের দাবি উঠলে কয়েকজনকে সাময়িকভাবে সরানো হলেও, অভিযোগ অনুযায়ী নিষিদ্ধ সংগঠনের সাবেক নেতা আহসান হাবিব ও হারুন অর রশিদকে আরও বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।”
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি কাজ বণ্টন নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, হারুন অর রশিদ তার ঘনিষ্ঠ আতিকুল ইসলামের স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডরয়েড কনসাল্ট্যান্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারস’-কে নিয়ম ও অনিয়ম—উভয় পথেই কোটি কোটি টাকার কাজ দিয়েছেন।
"প্রাপ্ত নথি ও সূত্র অনুযায়ী,অক্টোবর ২০২৪ থেকে গত ১১ মাসে,আতিকুল ইসলামের লাইসেন্স ব্যবহার করে,
মোট ২১টি কাজ দেওয়া হয়েছে,যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
এর মধ্যে—অ্যাডরয়েড-এর নামে ১৯টি কাজ (প্রায় ১.৭১ কোটি টাকা),
ACE-AT যৌথ উদ্যোগে ১টি কাজ (প্রায় ৪.৫ কোটি টাকা),
দ্য ইঞ্জিনিয়ারস অ্যান্ড আর্কিটেক্টস-এর নামে ১টি কাজ (প্রায় ৪.৪৪ কোটি টাকা)"
তথ্য বলছে, ১০ মার্চ ২০২৫ তারিখে হারুন অর রশিদ ৫টি LTM ও ১টি OTM পদ্ধতিতে মোট ৬টি কাজের দরপত্র আহ্বান করেন। আশ্চর্যজনকভাবে, ছয়টি কাজই পায় আতিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান অ্যাডরয়েড। ২১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে সব কটির কার্যাদেশ (NOA) দেওয়া হয়।
সূত্রগুলোর দাবি,একাধিক দরপত্রে একক দরদাতা দেখিয়ে প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
হারুন অর রশিদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট ও ছবি রয়েছে। বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা তাকে ‘বুয়েট শাখার সাবেক সহ-সভাপতি’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা দিয়েছেন। নির্বাচনের পর আওয়ামী প্রার্থীদের বিজয় উদযাপনেও তার উপস্থিতির ছবি পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগে কর্মরত থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে দরপত্র ছাড়াই কাজ করানোর অভিযোগ ওঠে। ৯ জুন ২০২৪ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দরপত্র আহ্বানের আগেই একটি ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। অভিযোগ স্বীকার করা হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
গণপূর্ত অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট কিছু অভিযোগ আমাদের নজরে আছে। যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান,
নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিধি অনুযায়ী তদন্ত হয়। তবে সব অভিযোগ প্রমাণিত নয়।
একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের বাইরে থাকলে কাজ পাওয়া কঠিন। দরপত্রে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত ফলাফল আগেই ঠিক হয়ে থাকে। প্রশাসন ও সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে,একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বারবার কাজ পাওয়া এবং একক দরদাতার প্রবণতা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এসব ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত জরুরি।
টিআইবি ঘনিষ্ঠ এক গবেষক বলেন,
পুনর্বাসনের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে তা সংস্কার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
কেন আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই?একই প্রতিষ্ঠানের হাতে অধিকাংশ কাজ যাওয়ার কারণ কী?একক দরদাতার মাধ্যমে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধি মানা হয়েছে কি না? জুলাই অভ্যুত্থানের পরও পুরোনো সিন্ডিকেট কীভাবে সক্রিয় থাকে?
সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তরে হারুন অর রশিদকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ শুধু একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়—এটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, সংস্কার ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সত্য উদঘাটনের পাশাপাশি জনআস্থা ফিরবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।