উদয়ের পথে
ঢাকায় বসেই একটি কথিত ‘আমেরিকান’ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণ করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ও বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মোখলেস উর রহমান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, একই উৎস থেকে অন্তত আরও ৩৬ জন ব্যক্তি—যাদের মধ্যে চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ধর্মীয় বক্তা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধানও রয়েছেন—সম্মানসূচক কিংবা পিএইচডি সনদ নিয়েছেন।তবে এই ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব ও বৈধতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।
২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২১ জনকে সম্মানসূচক পিএইচডি সনদ দেওয়া হয়। ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল আমেরিকান ইস্ট কোস্ট ইউনিভার্সিটি। এই আয়োজনের সমন্বয় করে রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত প্রতিষ্ঠান ইগনাইটেড ব্রেইন্স।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে American East Coast University নামে কোনো স্বীকৃত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগের তালিকা কিংবা স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় ডাটাবেজে এই নামের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তথ্য বলছে, এই নামের পাশাপাশি অন্তত আরও চারটি কথিত বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ঢাকায় বসে অর্থের বিনিময়ে পিএইচডি ও সম্মানসূচক ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে।
সূত্রমতে ইগনাইটেড ব্রেইন্সের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মূল কার্যালয় ভারতের দিল্লিতে। বাংলাদেশ অফিস দেখানো হয়েছে ঢাকার ধানমন্ডির সীমান্ত স্কয়ার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায়। তবে বাস্তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি ফটোকপি দোকান থেকেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ অফিসের প্রধান হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এখলাসুর রহমানকে।
প্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন কার্যক্রম সমন্বয় করেন আনজুমান আরা শিউলি, যিনি পেশায় একজন বিউটিশিয়ান বলে দাবি করেন একাধিক সুত্র ।
ইগনাইটেড ব্রেইন্সের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয় ভারতীয় নাগরিক ড. মহেশ গান্ধীকে। তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর অধ্যাপক বলে দাবি করা হলেও, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তালিকায় তার নাম পাওয়া যায়নি সূত্র বলছে ।
ঢাকার সমাবর্তনে সম্মানসূচক পিএইচডি পাওয়া ২১ জনের একটি তালিকা অনুসন্ধানী দলের হাতে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—
এছাড়া আরও অন্তত ১২ জনের নাম পাওয়া গেলেও তাদের পরিচয় যাচাই করা যায়নি।
পিএইচডি নেওয়া একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না। তবে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে বলে তারা স্বীকার করেছেন।
রংপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রহমান বলেন,আমি যতটুকু জানি, বিশ্ববিদ্যালয়টি ভুয়া নয়। ডিগ্রি নেওয়ার জন্য প্রসেস ফি দেওয়া হয়েছে।তিনি কত টাকা দিয়েছেন—সে বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।
ভুয়া পিএইচডি বিতর্কে সবচেয়ে আলোচিত নাম মোখলেস উর রহমান। সরকারি ওয়েবসাইটে তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ আছে—তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। তবে পিএইচডি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ নেই।
অন্যদিকে, বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তাঁর পরিচিতিতে লেখা রয়েছে—তিনি আমেরিকান ইস্ট কোস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন।
এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোখলেস উর রহমানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আহমেদ তাজমীন বলেন,খণ্ডকালীন শিক্ষকরা সাধারণত তাদের মূল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসেন। আমরা ধরে নিই সেখানে তাদের সনদ যাচাই করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে মোখলেস উর রহমানকে চুক্তিভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নানা বিতর্কের মুখে ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়।এর আগে জেলা প্রশাসক নিয়োগে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগেও তিনি আলোচনায় ছিলেন।
ইগনাইটেড ব্রেইন্সের বাংলাদেশ কার্যক্রমের সঙ্গে ডা. এখলাসুর রহমানের নাম ঘুরে ফিরে আসছে। তিনি দাবি করেছেন,আমেরিকান ইস্ট কোস্ট ইউনিভার্সিটি আছে। তবে বিস্তারিত বিষয় মহেশ গান্ধী ভালো জানেন।মহেশ গান্ধী হোয়াটসঅ্যাপে জানান, অর্থের বিনিময়ে ব্যক্তিগত প্রোফাইল মূল্যায়ন করে সম্মানসূচক ডিগ্রি দেওয়া হয়। তার ভাষায়,অনেকে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য নামের আগে ‘ডক্টর’ লিখতে এই ডিগ্রি নেন।
মন্তব্য করুন