নিজস্ব প্রতিবেদক
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নতুন প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বদলি বাণিজ্য, পিএইচডি ডিগ্রি জালিয়াতি এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ে নতুন করে অভিযোগ উঠছে। তথ্য বলছে, ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই তিনি প্রায় অর্ধশত বদলি করেন। কর্মকর্তারা বলছেন, এ বদলিগুলো “অস্বাভাবিক দ্রুত এবং “সুনির্দিষ্ট স্বার্থগোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে সূত্র জানায়।
খালেকুজ্জামান চৌধুরী দায়িত্ব পাওয়ার আগেই বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে আলোচনায় ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে—পিএইচডি ডিগ্রি জালিয়াতি,।বিদেশ ভ্রমণ ও অনুমোদনবিহীন চাকরি।ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি টাকার লেনদেন। নগর পরিকল্পনার নিরাপত্তা তদারকিতে অবহেলা।
সূত্র বলছে, ২০১৪ সালে তার পিএইচডি জালিয়াতির বিষয়টি ধরাও পড়েছিল। তবুও শাস্তি না পেয়ে তিনি পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে,প্রাইস পোস্টিং, পান। গণপূর্তের কর্মকর্তাদের মতে, এ ঘটনা প্রশাসনে নীতিগত প্রশ্ন তোলে।
বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মোঃ শামীম আখতার অবসরে যাওয়ার পর খালেকুজ্জামান নিয়োগ পাওয়ার পরই অধিদপ্তরের মধ্যে তিনটি শিবির গড়ে ওঠে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ—তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সিন্ডিকেট, তদবির ও বদলি বাণিজ্যের কার্যক্রম “আরও সুসংহত” হয়েছে।
সূত্র জানায়, কুয়েট, চুয়েট ও রুয়েটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। ২০১৫ সালে পাবনায় নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের গ্রিন সিটির টেন্ডার আহ্বানের সময় শত কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগগুলো নতুন নয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তদবিরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন এবং বর্তমানে তিনি বিএনপি সাজার চেষ্টা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, তার পরিবারের সদস্যরা অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন এবং তিনি নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করেন।একাধিক সূত্র জানাচ্ছে—তিনি সরকারি ছুটি, পিএইচডি ছুটি, ব্যবহার করে অস্ট্রেলিয়ায় অনুমোদনবিহীনভাবে চাকরি করেন এবং তিনি অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্ট হোল্ডার। কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ঘটনায় ডিজারশন মামলা হওয়ার কথা ছিল—যদিও তা হয়নি। তবে সূত্রের দাবি, তার অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব আছে। ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে—তিনি সাবেক পূর্তসচিব শহীদ উল্লা খন্দকারের ঘনিষ্ঠ ভাজন ছিলেন ও আর্থিক সমর্থন এর মাধ্যমে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি পেয়েছেন এবং শহীদুল্লাহ খন্দকারের বড় ছেলে ও তার পরিবার একই জায়গায় থাকেন। সেখানে তার স্ত্রীর নামে বাড়ি রয়েছে এবং শহীদুল্লাহ খন্দকারের ছেলের সঙ্গে যৌথভাবে একটি মার্কেট রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একজন কর্মকর্তার শাস্তি, অভিযোগ এবং পদোন্নতির মধ্যে এত বৈপরীত্য প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অভিযোগে বলা হচ্ছে— বিভিন্ন ওয়ার্কিং ডিভিশন থেকে নিয়মিত কালেকশন, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া,বিদেশে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো। সাভার সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ বদরুল আলমের মাধ্যমে এসব লেনদেন হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
নগর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে —গ্রিন কোজি কটেজ অগ্নিকাণ্ড ২০২৪ সালের গোড়ায় বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জন নিহত হন। অনুসন্ধান বলছে—২০১১ সালে এই ভবনের নকশায় অনুমোদন দেন খালেকুজ্জামান।
অভিযোগ রয়েছে—জরুরি বহির্গমন ছিল না, সিঁড়ি ছিল সরু, নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ হয়নি। কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বলেন—যদি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যথাযথ নজরদারি থাকত, ক্ষয়ক্ষতি কম হতে পারত। দায়িত্ব পাওয়ার পর কর্মকর্তাদের একাংশ বলছেন—তিনি এখন “সিন্ডিকেট, তদবির এবং আর্থিক নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করেছেন। তার সব বদলি বাণিজ্যের মূল হোতা বদরুল আলম । তিনি বর্তমানে তার হয়ে সব কিছু করছেন।
প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে প্রশাসনিক প্রভাব: বিশেষজ্ঞদের মতে—পদোন্নতি ও তদবির, আর্থিক লেনদেন,নিরাপত্তা তদারকি,আন্তর্জাতিক সংযোগ এসব এখন নতুন করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বদলি–বাণিজ্যের অভিযোগ: উল্লেখ্য, টানা বদলির তালিকায় নজর দেওয়া যাক (স্মারক নম্বর-২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১৯.১০৭.১১-১৪২৮। তারিখ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫) ৭ জনকে বদলি:/সৈয়দ ইসকান্দার আলী/জুবায়ের বিন হায়দার/নাজমুল আলম রববানী/মোঃ শরিফুল ইসলাম/মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান/ মোহাম্মদ তরিকুল আলম/রুবাইয়াত ইসলাম।
১৭ নভেম্বর ২০২৫—বিভিন্ন স্মারকে একাধিক বদলি। এদিন মোট ১৮ জন বিভিন্ন স্মারকে বদলি হন। স্মারক: ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১৯.১০৪.২৪-১৫১১/১ জন বদলি। রাজন চক্রবর্তী/ স্মারক: ১৫১৩। ৩ জন বদলি: (সব নাম অপরিবর্তিতভাবে থাকবে) স্মারক: ১৫১৫ /৪ জন বদলি। স্মারক ১৫১৪/ ৩ জন বদলি। স্মারক ১৫১৬/ ৪ জন বদলি। স্মারক ১৫১২ /৭ জন বদলি/ স্মারক ১৫৩০/৪ জন বদলি/স্মারক ১৫৩১/৪ জন বদলি/ স্মারক ১৫২৯/১ জন বদলি/ স্মারক ১৫২৮/১ জন বদলি। ৪০+ কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন—যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি বলে কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন— গণপূর্তের মতো দায়িত্বশীল দপ্তরে যেকোনো বড় পদে নিয়োগ স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও দক্ষতার মানদণ্ডেই হওয়া উচিত। অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতি, বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ এবং অতীতের বিভিন্ন বিতর্ক মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—
দেশের অবকাঠামো, প্রকল্প নিরাপত্তা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা কি এখন নতুন এক পরীক্ষার সামনে?
অভিযোগের বিষয়ে মতামতের জন্য খালেকুজ্জামান চৌধুরীরর মোবাইলফোনে ফোন দিলে তিনি ফোন ধরেননি। সিস্টেমে ভয়েস পাঠানোর জন্য ব্যবস্থা করে রেখেছেন তিনি।