স্টাফ রিপোর্টার
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) বহুল আলোচিত ও উচ্চাভিলাষী ‘সমগ্র বাংলাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ’ প্রকল্পটি অনিয়ম, দুর্নীতি ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্পের এস্টিমেটর (প্রাক্কলনিক) আনোয়ার হোসেন সিকদার এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও কিছু জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী।
সূত্র জানায়, এই সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কাজের গতি কমে গেছে, অনেক জেলায় টেন্ডার নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক ও অসন্তোষ।
‘সমগ্র বাংলাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ’ প্রকল্পটি ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা, যার লক্ষ্য দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে পৌর এলাকা পর্যন্ত শতভাগ নিরাপদ পানির আওতায় আনা—যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত।
কাগজে-কলমে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) থাকলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ, প্যাকেজ তৈরি, টেন্ডারের কাঠামো ও দরপত্রের শর্ত নির্ধারণে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছেন এস্টিমেটর আনোয়ার হোসেন সিকদার।
তথ্য বলছে, আনোয়ার সিকদার দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের এস্টিমেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার মধ্যে রয়েছে—
পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে বড় প্যাকেজ তৈরি
সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১০ শতাংশ বা তার বেশি অতিরিক্ত দর অনুমোদন
টেন্ডারের আগেই দর (রেট) ফাঁস
স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার
নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীদের মাধ্যমে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী উদয়ের পথে কে বলেন,
আমরা মাঠপর্যায়ে বরাদ্দ পাঠাই। পিডি অফিসে অনুমোদনের পর সেগুলো এস্টিমেটরের কাছে যায়। সেখান থেকেই ঠিকাদারদের কাছে রেট চলে যায়। পরে টেন্ডারে দেখা যায়, নির্দিষ্ট একজন ঠিকাদারই একাধিক কাজে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি গোপালগঞ্জ, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় সোলার প্যানেল, টিউবওয়েল ও আর্সেনিক দূরীকরণসংক্রান্ত একাধিক টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গোপালগঞ্জে প্রায় ১৫ কোটি টাকার একটি টেন্ডারে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। অভিযোগ রয়েছে, সরকার নির্ধারিত হারে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত দর আগেই নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত কাগজে ত্রুটি দেখিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হয়।
অন্য একটি টেন্ডারে চারজন দরদাতার মধ্যে প্রথম তিনজনকে বিভিন্ন অজুহাতে বাদ দিয়ে চতুর্থ অবস্থানে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪ কোটি টাকা বেশি দরে কাজ দেওয়ার চেষ্টা চলছে—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ঠিকাদাররা। তাঁরা পুনরায় দরপত্র আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন।
খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায়ও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। সেখানে এমনভাবে টেন্ডারের নকশা ও শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে—এমনটাই দাবি ভুক্তভোগীদের।
একজন স্থানীয় ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
আমরা ইজিপিতে অংশ নিতে চাইলে দেখি, এমন সব শর্ত দেওয়া হয়েছে যা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কাছেই আছে। এটা স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা নয়।
আরেকজন বলেন,
প্রকল্পটি জনস্বার্থের। কিন্তু এখানে যেন আগে ঠিকাদার ঠিক করা, পরে টেন্ডার।
আনোয়ার সিকদারের বেতন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডিপিএইচই সূত্র বলছে, ১০ম গ্রেডের এই কর্মকর্তার মূল বেতন ও ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় আনুমানিক ৪০ হাজার টাকার কম। অথচ অভিযোগ রয়েছে, তাঁর ঢাকায় একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিপুল সম্পদ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
একজন সরকারি কর্মকর্তার আয় ও সম্পদের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকলে সেটি অবশ্যই স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান হওয়া উচিত।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্র জানায়, আনোয়ার সিকদারের বিরুদ্ধে একটি মামলা চলমান রয়েছে। তবে মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে ডিপিএইচইর সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বলেন,
সরকারি চাকরি করে কেউ ঠিকাদারি কাজ করতে পারেন না। কেউ করলে তা চাকরি বিধির লঙ্ঘন। লিখিত অভিযোগ পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আনোয়ার সিকদার whatsapp কলে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
ইজিপিতে সব হয়, এখানে কারসাজির সুযোগ নেই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
সরকারি ক্রয় ও সুশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
এ ধরনের বড় প্রকল্পে যদি এস্টিমেট ও টেন্ডার প্রক্রিয়া কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জনসেবার মান ও প্রকল্পের টেকসই বাস্তবায়নে।
প্রশ্ন উঠছে… প্রকল্পের এস্টিমেট ও টেন্ডার প্রক্রিয়া কি যথাযথ তদারকির আওতায় আছে?
কেন একাধিক জেলায় একই ধরনের অভিযোগ উঠছে? দুদকের চলমান মামলার অগ্রগতি কোথায়?
দেশের কোটি মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করতে নেওয়া এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই বড় প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে।