উদয়ের পথে
ফার্সি শব্দ উজির অর্থ উচ্চপদস্থ মন্ত্রী বা উপদেষ্টা। আব্বাসীয় খলিফাদের শাসনামলে এই উপাধির প্রচলন শুরু হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এখনো ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ সরকারের গণপূর্ত অধিদপ্তরেও আছেন এমন একজন কর্মকর্তা—নাম তার উজির আলী। পদে তিনি একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হলেও, অভিযোগ উঠেছে—বিগত সরকারের সময়ে তার প্রভাব ও সুযোগ–সুবিধা ছিল অনেকটাই আব্বাসীয় যুগের ‘উজিরদের’ মতো।
সূত্র জানায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী প্রকৌশলীদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। ওই তালিকায় উপরের দিকেই রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. উজির আলী।
একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং এর মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন উল্লেখযোগ্য সম্পদ।
তথ্য বলছে, গত ১৭ বছরে তিনি মাত্র চার মাস ঢাকার বাইরে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি সংস্থাটির রক্ষণাবেক্ষণ (মেইনটেন্যান্স) জোনের দায়িত্বে আছেন।
২০২২ সালের ২২ এপ্রিল, আজিমপুরে জাজেস কমপ্লেক্সে গভীর রাতে কাজ করার সময় এক নির্মাণশ্রমিক ১০ তলা থেকে পড়ে মারা যান। ওই সময় উজির আলী সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা ও শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ না করার অভিযোগ ওঠে। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল নুরানী কনস্ট্রাকশন।
সূত্র জানায়, ওই সময় আজিমপুর এলাকায় নুরানী কনস্ট্রাকশনের আরও কয়েকটি প্রকল্প চলমান ছিল। উজির আলীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কমিশন বাণিজ্য নিয়ে তখন দপ্তরের ভেতরে আলোচনা চলছিল বলে দাবি করেন একাধিক কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হওয়ার সুবাদে উজির আলী টেন্ডার বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেন। আজিমপুর কলোনির ২০ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পে—২টি ভবনের কাজ পায় কুশলী নির্মাতা,৩টি ভবনের কাজ পায় মাসুদ অ্যান্ড কোং, ৪টি ভবনের কাজ দেওয়া হয় হাসান অ্যান্ড সন্স-কে,
এই বণ্টন নিয়েও স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিযোগ ওঠে।
কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার সময়ও উজির আলীর নাম আসে। যদিও তিনি সেখানে প্রায় এক বছরের মতো দায়িত্বে ছিলেন। সূত্র জানায়, ওই প্রকল্পে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ৩৭ জন কর্মকর্তার নাম একটি গোপন তদন্ত কমিটিতে উঠে আসে।
২০২১ সালে আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামিমকে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের ঘটনা তদন্তের দায়িত্বেও ছিলেন উজির আলী। অভিযোগ রয়েছে, এই ঘটনায় জড়িত প্রকৌশলী ফজলুল হক মধুর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাকে লঘু শাস্তির মাধ্যমে দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
এই বিষয়ে নাম না বলার শর্তে উজির আলীর পক্ষে সূত্রের দাবী ভিন্ন কিছু । তার ভাষ্য,
আমরা যে তদন্ত কমিটিতে ছিলাম, আমাদের কাজ ছিল কীভাবে অতিরিক্ত পরিশোধ করা টাকা ফেরত আনা যায়—তার একটি পরিকল্পনা দেওয়া। কে দোষী বা কাউকে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের ছিল না।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে ১০০ শতাংশ বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার (এপিপি) কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন দেন উজির আলী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি আওয়ামী লীগপন্থি ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্র দাবি করেছে, উজির আলীর নামে–বেনামে শত শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী—উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ৬ তলা বাড়ি,বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাট,
ধানমন্ডিতে প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট,গাজীপুরে স্ত্রীর নামে ৫ একর জমি,
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উজির আলী। তিনি বলেন,
আমি কখনোই বাড়তি কোনো ক্ষমতার অপব্যবহার করিনি। দপ্তর থেকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটাই পালন করেছি। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন।
প্রশ্ন উঠছে
দীর্ঘদিন ধরে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট আদৌ ভাঙা সম্ভব হবে কি? আর সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।