তামাটে পচা চাল কেনায় খাদ্য কর্মকর্তা বাচ্চু মিয়া বাধ্যতামূলক অবসরে
‘৩ কোটি টাকার নিম্নমানের চাল— প্রশ্ন উঠছে কেন এতোদিন তিনি দায়িত্বে ছিলেন?’
রাজশাহী প্রতিনিধি :
নিম্নমানের তামাটে ও পচা চাল কেনা এবং অসৎ উদ্দেশ্যে সরকারি গুদামে সংরক্ষণের অভিযোগে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. বাচ্চু মিয়াকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জয়নাল মোল্লা স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে তাকে সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর এই ঘটনায় বাচ্চু মিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
তথ্য বলছে — ১,২১১ টন চাল সরবরাহ হয়েছিল ৮টি চালকল থেকে
খাদ্য বিভাগের রেকর্ড অনুযায়ী, বাগমারার ভবানীগঞ্জ খাদ্য গুদামে মোট ১,২১১ টন চাল সরবরাহ করা হয়েছিল স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আটটি চালকল থেকে।
এই চালকলগুলো হলো—কনক চালকল,আরাফাত চালকল,ভাই ভাই চালকল,আবদুস সাত্তার চালকল (তানোর),বাদশা রাইস মিল (হড়গ্রাম),নুরজাহান চালকল (মোহনপুর) ,মাহফুজ চালকল, মোল্লা চালকল।
এই চাল সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন বাচ্চু মিয়া— যিনি আসলে একজন উপখাদ্য পরিদর্শক হলেও তাকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতির বাইরে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগ — ‘ভালো চাল বদলে নিম্নমানের চাল মজুত’ উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে গুদামে পাওয়া যায় তামাটে রঙের পচা চাল। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এই চাল খাওয়ার অনুপযোগী। অভিযোগ উঠেছে, বাচ্চু মিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ভালো মানের চাল পরিবর্তন করে নিম্নমানের চাল মজুত করেছেন।
খাদ্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ একটি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়-
“গুদামে সরবরাহ করা ভালো মানের চালের পরিবর্তে অসৎ উদ্দেশ্যে নিম্নমানের চাল রাখা হয়েছে। এতে সরকারের অন্তত ৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
খাদ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বাচ্চু মিয়াকে ভবানীগঞ্জ খাদ্য গুদামের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নীতিমালা উপেক্ষা করে।
একজন কর্মকর্তা বলেন,
এই পদে খাদ্য পরিদর্শক থাকা সত্ত্বেও বাচ্চু মিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পদোন্নতি বা পদায়নের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মানা হয়নি।
আরেকজন যোগ করেন,
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। সেই প্রভাবেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে— মো. বাচ্চু মিয়ার চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। তাকে জনস্বার্থে সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া প্রয়োজন বলে সরকার মনে করে। তাই রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হলো।
তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সূত্র বলছে, এই অবসর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং প্রশাসনিক ‘এক্সিট’ প্রক্রিয়া। ফলে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে— এত বড় অভিযোগের পরও কেন তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা আর্থিক জবাবদিহি শুরু হয়নি?
ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ — ‘আমাদের চালের দাম কমে গেল’ গুদামে নিম্নমানের চাল মজুতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও সরবরাহকারীরা।
একজন কৃষক বলেন,
আমরা ভালো ধান দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে গুদামে গিয়ে দেখি পচা চাল মজুত। এতে আমাদের সুনামও নষ্ট হয়েছে, দামও কমে গেছে।”
আরেকজন সরবরাহকারী অভিযোগ করেন— দায়িত্বে যারা ছিলেন, তারা ভালো চাল পরিবর্তন করে নিম্নমানের চাল ঢুকিয়েছে। এতে প্রকৃত সরবরাহকারীরাও এখন সন্দেহের মধ্যে পড়েছে।
এই ঘটনায় বাচ্চু মিয়াকে শুধু বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে— কিন্তু বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক ক্ষতির দায়ে ফৌজদারি তদন্ত বা জবাবদিহি প্রক্রিয়া চালু হয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, শুধু অবসর কোনো সমাধান নয়। এখানে রাষ্ট্রের অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শাস্তির আওতায় না আনলে এই ধরনের দুর্নীতির সংস্কৃতি চলতেই থাকবে।
গবেষক ও কৃষি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. মাহমুদ হাসান বলেন
বাংলাদেশে সরকারি গুদামে নিম্নমানের চাল বা ধান সংরক্ষণ নতুন কিছু নয়। এই ঘটনা কাঠামোগত দুর্নীতিরই প্রতিফলন। এখানে শুধু একজন কর্মকর্তাকে অবসর দিয়ে দায় এড়ানো যাবে না।”
তিনি আরও বলেন—
“একই ধরনের অভিযোগ দেশে আরও অনেক খাদ্য গুদামে পাওয়া গেছে। প্রকৃত সমাধান চাইলে সরবরাহ প্রক্রিয়া, গুদাম ব্যবস্থাপনা ও তদারকি পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়,
গত ৫ বছরে অন্তত ৪৩টি খাদ্য গুদামে নিম্নমানের চাল বা ধান সংরক্ষণের অভিযোগ উঠেছে,
যার মধ্যে ১৯টি ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মেলে,
কিন্তু মাত্র ৭টি ঘটনায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এই পরিসংখ্যান বলছে— এই ধরণের দুর্নীতির ঘটনায় জবাবদিহির হার অত্যন্ত কম।
সরকারি চাকরি আইন ও দণ্ডবিধির ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় অর্থ ক্ষতির দায়ে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা সম্ভব।
অ্যাডভোকেট সৈয়দ শওকত হোসেন বলেন—
সরকার চাইলে এই ঘটনায় শুধু অবসর নয়, অর্থ পুনরুদ্ধার ও ফৌজদারি অভিযোগ গঠন করতে পারে। কারণ এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে ভালো চাল বদলে নিম্নমানের চাল মজুতের অভিযোগ উঠেছে, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”
প্রশ্ন উঠছে, কেন যোগ্য কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে বাচ্চু মিয়াকে দায়িত্বে বসানো হয়েছিল?
নিম্নমানের চাল মজুতের পেছনে আরও কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না?
সরকারের আর্থিক ক্ষতির জন্য দায়ী কে বা কারা?
শুধুই অবসর দিয়ে কি দায় শেষ হয়ে যাবে?
এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ কবে দেখা যাবে?
সূত্র জানায়, স্থানীয় খাদ্য গুদামে তদারকি দুর্বল হওয়ায় এবং সরবরাহ যাচাই প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির সুযোগ থাকায় এই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটছে।
একজন জেলা পর্যায়ের খাদ্য কর্মকর্তা বলেন—
“গুদামে চাল সরবরাহের সময় সঠিকভাবে মান যাচাই না করা, ওজন না মাপা এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী সরবরাহকারীদের প্রতি ‘নরম মনোভাব’— এই সব কারণেই অনিয়ম ধরা পড়ে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের চাল মজুত শুধু খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে না, এটি বাজারে সরবরাহ ব্যাহত করে, কৃষকের ন্যায্য মূল্য কমিয়ে দেয় এবং রাষ্ট্রীয় খাদ্য ভান্ডারের ওপর জনআস্থা নষ্ট করে।
ড. মাহমুদ হাসান বলেন—
“এ ধরনের অনিয়ম কৃষক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গবেষক ও দুর্নীতি বিরোধী সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে—
খাদ্য গুদামে মান যাচাইয়ের ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
লাইসেন্স ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে।
দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করতে হবে।
জনস্বার্থে অবসর দিয়ে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
কৃষক ও সরবরাহকারীদের অভিযোগ গ্রহণ ও অনুসন্ধানের স্বতন্ত্র সেল গঠন করতে হবে।
তামাটে পচা চালের এই ঘটনা বাংলাদেশের খাদ্য গুদাম ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং জবাবদিহিহীনতার একটি নগ্ন উদাহরণ। একজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ৩ কোটি টাকার ক্ষতির দায় কে নেবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তদারকি, আইনি পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত না এলে এমন অনিয়ম আবারও ঘটবে— এ কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।