অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Jan 4, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ঠিকাদারি ও বদলি বাণিজ্যের হোতা গণপূর্তের বদরুল


বিশেষ প্রতিবেদক
সরকারি অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। সাভার গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মোহাম্মদ বদরুল আলম খান-এর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।

গত ১০ ডিসেম্বর দুদকে জমা দেওয়া ওই অভিযোগে বলা হয়, প্রায় দুই দশক ধরে বদরুল আলম খান রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অনিয়ম করেছেন। ২০০৩ সালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তদবির ও গ্রুপিংয়ের মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগ দেন তিনি। অভিযোগকারীদের দাবি- চাকরির শুরু থেকেই তিনি আওয়ামী রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। ভোলা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায়- বড় সরকারি প্রকল্পের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, প্রকল্পমূল্যের ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়, এভাবেই একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন তিনি বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

তথ্য বলছে, ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে এক পর্যায়ে তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়। তবে রাজনৈতিক প্রভাব এবং টাকার কারণে সেই শাস্তি কার্যকর হয়নি। বরং পরবর্তীতে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে পুনর্বহাল করা হয় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। একজন গণপূর্ত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওএসডি হওয়ার পরও যেভাবে তিনি আবার প্রভাবশালী পদে ফিরেছেন, সেটি প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। ২০২৪ সালের পর বদরুল আলম খানকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাভার গণপূর্ত সার্কেলে পদায়ন করা হয়। এই সার্কেলের আওতায় রয়েছে মিরপুর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও সাভার। এই চার অঞ্চলে বর্তমানে শত শত কোটি টাকার সরকারি নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি বিধি উপেক্ষা করে তিনি অধিকাংশ কাজ ওটিএম (ওপেন টেন্ডার মেথড) নয়, প্রভাব খাটিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলকভাবে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের মধ্যে বণ্টন করেন এবং কমিশন আদায় করেন। দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, বদরুল আলম খানের বৈধ আয়ের সঙ্গে তার সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। অভিযোগ অনুযায়ী- তার নামে ও পরিবারের নামে রয়েছে- গুলশানে বিলাসবহুল একাধিক ফ্ল্যাট, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক প্লট, স্ত্রীর নামে গার্মেন্টস ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসা, ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর। সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়— সম্প্রতি সে পূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের কাছের লোক এবং প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান তার লোক এই পরিচয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলির নামে কোটি টাকা আদায়, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ গ্রহণ, পদায়নের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়-এসব কার্যক্রমে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই সব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর ভোলায় টিকতে না পেরে বদরুলের আশ্রয়ে ঢাকায় এখন গণপূর্তের ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন তিনি। বদরুলের অধীনে থাকা মিরপুরে গণপূর্তের রেস্টহাউজে প্রায়ই থাকেন এই পলাশ।

বদরুল সিন্ডিকেটের ইএম অংশের কাজের দেখাশোনা করেন ব্রাম্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম সোরাব। সে তৎকালীন গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে গণপূর্তে ছড়ি ঘুরিয়েছেন। এছাড়া সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামের দূরসম্পর্কের আত্মীয় পরিচয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে একক আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পরে এই সাইদুলকে নিজ এলাকার লোক হিসেবে সিন্ডিকেটভুক্ত করেন বদরুল আলম খান। মিরপুরের সরকারি আবাসন প্রকল্পে কাজ দেওয়া, সংসদ ভবন ও মন্ত্রিপাড়ায় এককভাবে কাজ করছেন এই সাইদুল ইসলাম সোরাব। সম্প্রতি কুমিল্লায় ইএম এর একটি টেন্ডারে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে কাজ নেয়ার চেষ্টা করেছিল তার প্রতিষ্ঠান আল মদিনা ট্রেডার্স। সাইদুলের আরেক পরিচয় হচ্ছে ফ্যাসিবাদের দোসর জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মামুনুর রহমানের মেয়ে জামাই। মামুন বর্তমানে জুলাই গণহত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলে রয়েছেন। আর তার জামাই চালাচ্ছেন গণপূর্তের ঠিকাদারী সিন্ডিকেট। ভুয়া সার্টিফিকেটে কাজ দিতে কুমিল্লার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে চাপ সৃষ্টি করে বদরুল, একাধিক অভিযোগকারী দাবি করেছেন। 
গণপূর্তের টেন্ডার বাণিজ্য ছাড়াও বদলি বাণিজ্যে বদরুলের পার্টনার হিসেবে রয়েছেন ‘তথাকথিত প্রফেসর’ মনির। সে নিজেকে সচিবের ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে বদলি বাণিজ্যে বদরুলের হাতকে শক্তিশালী করেছেন। গত রোববার ব্যাকডেটে তিনজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি করে এই সিন্ডিকেট। ৯ ডিসেম্বর প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান এতে স্বাক্ষর করলেও ডিজিটাল নথিসহ গণপূর্তের নথিতে তা ছিল। এতে গণপূর্তের ২৮ ব্যাচের কর্মকর্তা ইমতিয়াজ আহমেদকে খাগড়াছড়ি থেকে বদলি করে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-২ এ বদলি করা হয়। এই বদলি প্রক্রিয়ায় প্রাথমিকভাবে প্রায় কোটি টাকা লেনদেন হলেও ভবিষ্যতে আরো টাকা অথবা কাজ দেয়ার কথা রয়েছে।

এই বিভাগের আওতায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের গ্রামের বাড়িতে একটি মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং 
ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কাজ আসছে। যাতে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার কাজের টেন্ডার হবে। এই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জহির রায়হানকে দেয়া হয়েছে ব্রাম্মণবাড়িয়া গণপূর্ত বিভাগে। এছাড়া রিজার্ভে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী সোমেন মল্লিককে দেয়া হয়েছে খাগড়াছড়িতে। সোমেন মল্লিকের পদায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে 
অভিযোগকারীদের দাবি। টিআইবির একজন কর্মকর্তা বলছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে- সরকারি নির্মাণ খাতে দুর্নীতির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। একজন গবেষক বলেন, যদি রাজনৈতিক পরিচয় বদলে একই ব্যক্তি বারবার পার পেয়ে যান, তাহলে জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের হাসপাতাল, আদালত, থানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক দুর্নীতির অভিযোগ সরকারি অর্থের সুরক্ষা ও জনস্বার্থ-উভয় ক্ষেত্রেই বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।

অভিযোগের বিষয়ে মতামতের জন্য বদরুল আলমকে মোবাইলফোনে ফোন দিলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, কিছু কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অপু বিশ্বাসের সাদা গোলাপ আর মিষ্টি হাসি: রহস্য এবং আবেগের মি

1

সরকারের পাওনা ১২৬ কোটি টাকা, ফাঁকি দিতে অভাবনীয় জালিয়াতি ওসম

2

বিপ্লব ও সংহতি দিবসে মোল্লাহাটে মহিলা দলের কর্মী সমাবেশ

3

গোপন মুহূর্তের ছবি ফাঁস হলে সেটা গোপনীয়তা

4

ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার ভয়াবহ হামলা

5

কমিশন ছাড়া কাজ হয় না, নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল!

6

তদবির নয়, ভাগ্য নির্ধারণ করল কর্মস্থল —খুলনার বিভাগীয় কমিশনা

7

আরও ১৪ সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব

8

আস্থার সংকটে গ্রাহকরা ‘ওবিই’ ইকবাল আবার এনআরবি’র চেয়ারম্যান

9

সুন্দরবনে নিখোঁজ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড

10

উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ‘অস্থিতিশীলতা’র নিন্দা

11

মোংলা উপজেলা পানি কমিটির আয়োজনে  দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ অনু

12

কমলগঞ্জে ফেনসিডিলসহ কারবারি আটক!

13

পূর্বাচলে জিন্দাপার্ক সংলগ্ন স্থানীয় আদিবাসীদের সাথে রাজউক

14

চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উম্মোচন করছে আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তি

15

প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন নীতিমালা পুনর্মূল্যায়নে ১৭ সদস্যের কমিট

16

১৮ কোটির সম্পদের প্রমাণ, বৈধ মো. মোমিনুল ইসলাম কেবল ৬ কোটি

17

সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিদেশি সম্পদ, ২৩ বস্তা নথি উদ্ধার

18

বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ভাইরাল, দুদকের

19

মৌলভীবাজারে দুর্গোৎসবকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময়

20