অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Dec 8, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

পূর্বাচল তিন দশকের অচলাবস্থা, ৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয়, তবু কেন বাসযোগ্য হলো না?

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা মহানগরীর জনচাপ কমিয়ে রাজধানীর পাশেই একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও স্বনির্ভর আবাসিক নগরী গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরু হয়েছিল পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের। প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেছে, প্রকল্পের ব্যয় ইতোমধ্যে ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—এখনও পূর্বাচল পুরোপুরি বসবাসযোগ্য হয়নি। মৌলিক নাগরিক সুবিধা যেমন পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, নিরাপদ সড়ক, গণপরিবহন, হাসপাতাল, কোথাও নেই পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউক এখন নতুন করে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরাদ্দ নীতি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সংস্কার না হলে আরও অর্থ ব্যয়ের পরও পূর্বাচল বাস্তব অর্থে বাসযোগ্য শহরে পরিণত নাও হতে পারে।


৩০ বছরের প্রকল্প, তবুও ‘অবাসযোগ্য’ শহর, প্রকল্প–ঘটিত নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল— ঢাকার মধ্যবিত্তের আবাসন সংকট কমানো।জনসংখ্যার চাপ কমানো, একটি আধুনিক গ্রিন–সিটি গড়ে তোলা। কিন্তু তিন দশক পর এই লক্ষ্য কতটা পূরণ হলো? তথ্য বলছে, প্রকল্প এলাকায় এখনও পূর্ণাঙ্গ পৌর–সুবিধা নেই। সূত্র জানায়, প্রায় ২৫ শতাংশ প্লটে এখনও কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। যে বাড়িগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোও বাসযোগ্যতা সংকটের কারণে বেশিরভাগই খালি পড়ে আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ অভিযোগ করে বলেন, দরিদ্র জনগণ থেকে অধিগ্রহণ করা জমির বড় অংশ বরাদ্দ গেছে এমন ব্যক্তিদের কাছে, যাদের আসলে নতুন আবাসনের প্রয়োজনই ছিল না। ফলে প্লটগুলো বছরের পর বছর খালি পড়ে আছে।
তিনি আরও বলেন,
যাদের বিকল্প আবাসন আছে তাদের প্লট বরাদ্দ বাতিল করা হলে রাতারাতি পূর্বাচলে মানুষের বসবাস শুরু হতে পারত। বরং নতুন প্রকল্প নিয়ে আরও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে—এটা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে।


পূর্বাচলের ১০ নম্বর সেক্টরে একটি প্লট নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন ব্যবসায়ী সফিকুল আলম। কিন্তু পরিবার নিয়ে সেখানে থাকতে পারছেন না। তিনি বলেন, গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ ঠিকমতো আসে না, পানির লাইন হয়নি—এই অবস্থায় পরিবার এনে রাখব কীভাবে? রাতে রাস্তায় আলো নেই, নিরাপত্তাও নেই।আরেক ভুক্তভোগী সুলতানা আক্তার বলেন,প্লট পেতে ১৫ বছর অপেক্ষা করেছি। এখন বাড়ি তৈরি করলাম, কিন্তু স্কুল, হাসপাতাল, বাজার কিছুই নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পরিবহন—একটি বাসও পাওয়া যায় না।

তাদের মতো অসংখ্য প্লটমালিক দীর্ঘদিন ধরে এই অবকাঠামোগত ঘাটতির ভুক্তভোগী।

নতুন ৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প: কী থাকবে এতে? রাজউক গত আগস্টে ‘পূর্বাচল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’ শীর্ষক ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ৮,৮৭০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত ব্যয়ের খাতগুলো হলো— ভূমি উন্নয়ন – ১৮৭ কোটি টাকা,। ৩৩৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন – ১,৫১১ কোটি,। নতুন রাস্তা নির্মাণ – ৩২৩ কোটি, ১০টি স্লুইচগেট ও একটি বক্স কালভার্ট। ১৬১ কোটি ২০ হাজার বর্গমিটার আবাসিক ভবন – ১৪০ কোটি। ২৭৬টি মসজিদ ও তিনটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান – ৭৬৭ কোটি।
স্ট্রিট লাইট – ৫৪৫ কোটি,১৯টি কাঁচাবাজার – ১,৩৪০ কোটি।পূর্বাচল স্কুল অ্যান্ড কলেজ – ২৮৮ কোটি।


তথ্য বলছে, প্রকল্পটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের জুনে শেষ হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের মন্তব্য, “স্কুল নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি পুনঃমূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মানে, ব্যয় যৌক্তিক কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন—রাজউকের মূল ভুল ছিল প্লট বিক্রি–কেন্দ্রিক নীতি। তিনি বলেন, রাজউকের উচিত ছিল ফ্ল্যাট বানিয়ে সরাসরি মধ্যবিত্তের কাছে বিক্রি করা। কিন্তু তারা প্লট বরাদ্দ দিয়ে এমন একটি বাজার তৈরি করেছে, যেখানে পরিশ্রম ছাড়া বহু মানুষ কেবল জমি কিনে বিক্রি করে ধনী হয়েছে। এটি আইনের শাসন ও জনস্বার্থের পরিপন্থী।
তিনি আরও যোগ করেন,
নতুন প্রকল্প পূর্বাচলকে বাসযোগ্য করতে সাহায্য করবে, তবে প্লট–বাণিজ্য বন্ধ না হলে এই শহর কখনোই মধ্যবিত্তের নাগালের আবাসন হবে না।

পূর্বাচলে ৫–১০ কাঠার প্লট হাতবদল হলে দাম ৩ থেকে ৭ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে— ২০০০ সালে পূর্বাচলের একটি ৫ কাঠার প্লটের দাম ছিল ৮–১২ লাখ টাকা, বর্তমানে একই প্লটের দাম হয়েছে ৬০ লাখ থেকে ৮০ লাখ টাকা, কখনো আরও বেশি।

প্রশ্ন উঠছে, এত উচ্চমূল্যের জমিতে সাধারণ মানুষ কীভাবে বাড়ি করবে? এমনকি অবকাঠামো সম্পূর্ণ হলেও কি মধ্যবিত্ত সেখানে বসতি স্থাপনে সক্ষম হবে?

রাজউকের ব্যাখ্যা, রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন— নতুন প্রকল্পটি মূলত পূর্বাচল নতুন শহরের অসমাপ্ত অবকাঠামো সম্পূর্ণ করার জন্য নেওয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন, রাস্তা, বাজার, ধর্মীয় স্থাপনা, ফুটপাত, সড়কবাতি, সবই আধুনিক মানে করা হবে।
তবে তিনি স্বীকার করেন,
অতীতে কিছু বিলম্ব ছিল, কিন্তু এবার আমরা সময়মতো কাজ শেষ করব।


পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“জীবনযাত্রার ন্যূনতম সুবিধা ছাড়াই পূর্বাচলে বহুতল মসজিদ, মার্কেট, স্কুল—এসব নির্মাণ যৌক্তিক কি না—তা পুনঃমূল্যায়ন প্রয়োজন।

একজন অতিরিক্ত সচিব কবির আহামদ বলেন—
যেখানে মানুষ চলাচলে সংকটে পড়ে, রাতে নিরাপত্তা নেই, পানির লাইন নেই—সেখানে কে যাবে? আগে মৌলিক অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।


পরিসংখ্যান বলছে: পরিকল্পনায় অদক্ষতা, বিভিন্ন গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য—পূর্বাচলে প্রস্তাবিত জনসংখ্যা – ১৬ লাখ।বর্তমানে বসবাস করছেন – আনুমানিক ২০–২৫ হাজার।প্লট বরাদ্দ সংখ্যা – ২৫,০১৬।বাসযোগ্য ভবন তৈরি হয়েছে – প্রায় ৪,০০০।বাসযোগ্য ভবনের অনুপাত – মাত্র ১৬%।

শহর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এই পরিসংখ্যানেই বোঝা যায়—পূর্বাচল একটি অপরিকল্পিত প্লট-বাজারে পরিণত হয়েছে, আবাসিক শহরে নয়। নিরাপত্তা ও পরিবহন: সবচেয়ে বড় দুই সংকট ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্র বলছে—রাতে সেক্টরের রাস্তাগুলোয় স্ট্রিট লাইট নেই বা অকার্যকর, ফলে নিরাপত্তা কম।
পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই,জরুরি সেবা পৌঁছাতে ২০–৩০ মিনিট সময় লাগে,জলাবদ্ধতা হলে রাস্তায় চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই অবস্থায় পরিবার নিয়ে বসবাস ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন অধিকাংশ প্লটমালিক।


যে কারণে প্রশ্ন উঠছে নতুন ৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পকে ঘিরে,নগর গবেষকদের মতে— মৌলিক সুবিধা ছাড়া অন্য অবকাঠামো কেন? পুরোনো সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি, নতুন প্রকল্প কতটা কার্যকর হবে?

প্লট–নীতির পরিবর্তন ছাড়া বসতি গড়া সম্ভব?  জমি–বাণিজ্য ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত কি টিকে থাকতে পারবে? অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে আরও ব্যয় করলে টাকার অপচয়ের ঝুঁকি থেকেই যাবে।


অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ, একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষায় দেখা যায়— পূর্বাচলে জনগণ বসতি স্থাপন করলে ঢাকা শহরের যানজট ৭–১০% কমতে পারে।কিন্তু বসতি স্থাপন না হওয়ায় এসব সম্ভাব্য সুফল হাতছাড়া হচ্ছে।গবেষণায় বলা হয়েছে—“বাসযোগ্যতা তৈরি না হলে ২০৩৫ সালের আগে পূর্বাচল একটি পূর্ণাঙ্গ শহরে রূপ নেবে না।

 পূর্বাচলের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়িয়ে? তিন দশক পরও পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প একটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি হয়ে আছে। নতুন ৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প এ শহরকে বাসযোগ্য করবে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

জনগণের অভিযোগ, পরিসংখ্যান, বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে মূল সমস্যাগুলো তিনটি—প্লট-কেন্দ্রিক নীতি, মৌলিক অবকাঠামোতে ঘাটতি,অতিরিক্ত ব্যয়, কিন্তু ধীর বাস্তবায়ন,


যদি নীতিগত সংস্কার না হয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য প্রকল্প বাস্তব সুবিধায় পরিণত না হয়—তাহলে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও হয়তো পূর্বাচল কেবল একটি অর্ধনির্মিত শহর হয়েই থাকবে।



মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিটিআরসির ডেটা গতি ও দাম নিয়ে তীব্র অভিযোগ

1

লালমনিরহাটে বিএনপির সদস্য সংগ্রহে জনস্রোত

2

ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন আয়োজনে সরকার বদ্ধপরিকর : আইন

3

৪৮ রানে ৭ উইকেট হারাল পাকিস্তান, ওয়ারিকানের স্পিন–ঘূর্ণি

4

গোপালগঞ্জে ১০ দিনের কন্যাশিশুকে পানিতে ফেলে হত্যা: প্রশ্নের

5

ধনবাড়ীতে মাসিক আইন-শৃঙ্খলা সভা অনুষ্ঠিত

6

ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার ভয়াবহ হামলা

7

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার আর কোনো পরিকল্পনা ইরানের নেই বল

8

সাংবাদিক শুভ্রর নিরাপত্তা দাবি, অপরাধচক্র দমনে প্রধানমন্ত্রী

9

রাজশাহীতে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ, চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

10

পিতার মানবিক আদর্শই আমার পথপ্রদর্শক ;সুচন্দার ছেলে তপু

11

নানা অনিয়মের অভিযোগে পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অবশেষে বদলি

12

কুমিল্লায় ১১৯০ পিস ইয়াবাসহ স্বামী-স্ত্রী আটক, নগদ ৩ লাখ ৩১

13

বুয়েট শিক্ষার্থীদের পদযাত্রা ঠেকাতে গিয়ে সংঘর্ষ, আহত ৮ পুলিশ

14

ঘাটাইলে ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত

15

বিএনপি জনগণের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা করেছে: নাহিদ ইসলাম

16

সোনালী ব্যাংকে আনুগত্য বদলের ঝড়: চট্টগ্রামের এক ইঞ্জিনিয়ার ঘ

17

মামদানির জয়ে আমরা সার্বভৌমত্ব হারিয়েছি : ট্রাম্প

18

সৌদি বাংলা ট্রাভেলস’-এর নামে হজ প্রতারণা: শামসুদ্দিন তোহা

19

সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু

20