উদয়ের পথে
বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর যখন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলছে, তখনই গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, কমিশন বাণিজ্য ও সম্পদ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ—যিনি এক সময় পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিজেকে প্রভাবশালী মহলের লোক হিসেবে পরিচয় দিতেন মো. কায়কোবাদ। তখন তিনি তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন নির্বাহী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত।
বর্তমানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে “বিএনপি ঘরানার” হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন এবং কথিত বিএনপি-সমর্থিত ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের দাবি অনুযায়ী, মো. কায়কোবাদ অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
" ঢাকার ধামরাইয়ে নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবন
নিজ জেলা শেরপুরে কয়েকশ বিঘা জমি
মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট
পরিবারের জন্য ব্যবহৃত দামি গাড়ি
এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান "
যদিও এসব সম্পদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে—এই সম্পদের সঙ্গে তার বৈধ আয়ের কোনো সুস্পষ্ট সামঞ্জস্য নেই।
সূত্র জানায়, সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর বদলির পর মো. কায়কোবাদ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগের পর তিনি ঢাকায় বদলির জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে তদবির করেন।
এনিয়ে এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বদলির জন্য একদিকে সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের অর্থ দেওয়া হয়, অন্যদিকে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর আস্থা অর্জনে ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত উপস্থিতি বাড়ানো হয়।”
পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনের বদলি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ব্যাকডেটে ফাইল স্বাক্ষরের মাধ্যমে নিজ পছন্দের গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-২-এ যোগদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-২ এ যোগদানের পর পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয় বলে অভিযোগ। একাধিক ঠিকাদার দাবি করেছেন—অধিকাংশ কাজ ২০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের দেওয়া হয়।
ন্যূনতম ৫ শতাংশ ঘুষ ছাড়া কোনো প্রাক্কলন অনুমোদন হয় না।দরপত্র, এপিপি ও টিইসি অনুমোদনে নগদ অর্থ বা “উপহার” দাবি করা হয়।পূর্বে কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারদের ডেকে এনে সিন্ডিকেটের লোকদের অর্থ দিতে বাধ্য করা হয় এক ঠিকাদার বলেন,ঘুষ না দিলে ফাইল মাসের পর মাস আটকে থাকে। কেউ প্রতিবাদ করলে কাজ হারানোর ভয় দেখানো হয়।
এই অভিযোগগুলো নিয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে সংবাদকর্মীদের প্রতিও বাধা ও হুমকির অভিযোগ উঠেছে। এক প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী—অফিসে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, বাইরে গেলে সন্ত্রাসী দিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সংবাদ করলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। এমনকি একজন প্রতিবেদককে দপ্তরে আটকে রেখে অপমান করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র দাবি করছে, দুদক এক সময় সংশ্লিষ্ট সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালালেও মো. কায়কোবাদের বিষয়ে কার্যকর অনুসন্ধান হয়নি। প্রশ্ন উঠছে—তার ক্ষমতার উৎস কোথায়? দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,অভিযোগ থাকলে অবশ্যই অনুসন্ধান হবে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণ ও লিখিত অভিযোগ প্রয়োজন।
সুশাসন ও দুর্নীতি গবেষকদের মতে, প্রশাসনে রাজনৈতিক পরিচয় বদলের সংস্কৃতি দুর্নীতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। একজন গবেষক বলেন,যখন একজন কর্মকর্তা রাজনৈতিক ছত্রছায়া বদলে টিকে থাকতে পারেন, তখন জিরো টলারেন্স নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এই সব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার মো. কায়কোবাদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি।
-