স্টাফ রিপোর্টার
কথায় আছে, কপালের নাম গোপাল। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক ক্যাডারের সাম্প্রতিক পদোন্নতির ঘটনাকে অনেকেই সেই প্রবাদকেও ছাপিয়ে যাওয়া এক ব্যতিক্রমী নজির হিসেবে দেখছেন। অভিযোগ উঠেছে, নির্দিষ্ট একজন কর্মকর্তাকে কমিশনার করার লক্ষ্যেই দফায় দফায় পিছিয়েছে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) বৈঠক। শেষ পর্যন্ত মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে যুগ্ম কমিশনার থেকে পদোন্নতি দিয়ে সোমবার মধ্যরাতে তাকে কমিশনারের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, এই পদোন্নতির কেন্দ্রে রয়েছেন ২৪তম ব্যাচের শুল্ক ক্যাডার কর্মকর্তা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন রিপন। রোববার পদোন্নতির সিদ্ধান্ত হলেও, বিষয়টি কার্যকর করা হয় সরকারি ছুটির আগের দিন সোমবার মধ্যরাতে। তবে বিস্ময়করভাবে, সব ক্ষেত্রে অটোমেশন ও ডিজিটাল স্বচ্ছতার কথা বলা হলেও এনবিআর বা অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) ওয়েবসাইটে এই পদোন্নতির তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
সূত্রের দাবি অনুযায়ী, স্বর্ণ চোরাচালান সংক্রান্ত এক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাকে মাত্র ১৪ মাসের ব্যবধানে চার দফায় পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে—যা প্রশাসনের ভেতরেই বিস্ময় ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী,প্রথমে তাকে সহকারী কমিশনার থেকে উপকমিশনার করা হয়,
পরে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিতে যুগ্ম কমিশনার,এরপর ৪ ডিসেম্বর অতিরিক্ত কমিশনার,
এবং সর্বশেষ সোমবার কমিশনারের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে, অতিরিক্ত কমিশনার পদে পদোন্নতির আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ১৭ নভেম্বর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানায় যে, ওই কর্মকর্তার নামে মামলা চলমান রয়েছে। তবে পরবর্তীতে ২৫ নভেম্বর দুদকের আরেক পরিচালক একটি অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দেন।
দুদকের দুই পরিচালকের দুই ভিন্ন ধরনের চিঠি ঘিরে এনবিআরের ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার মধ্যরাতে কমিশনার পদে চলতি দায়িত্ব পাওয়া অন্য কর্মকর্তারা হলেন—
শামীমা আক্তার, মো. রইচ উদ্দিন খান, মুহা. মাহবুবুর রহমান, মো. গিয়াস কামাল, মোহাম্মদ সফিউর রহমান, মো. মুশফিকুর রহমান এবং মানস কুমার বর্ধন।
এনবিআর সূত্র জানায়, এই আটজনকে পদোন্নতি দিতে গিয়ে শুল্ক ক্যাডারের আরও পাঁচজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সুপারসিড করা হয়েছে। এতে ক্যাডারের ভেতরে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে বলে দাবি করছেন একাধিক কর্মকর্তা।
প্রশ্ন উঠছে
এই পদোন্নতি ঘিরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—কেন একটি নির্দিষ্ট কর্মকর্তার জন্য ডিপিসির বৈঠক বারবার পেছানো হলো?দুদকের ভিন্নমুখী দুটি চিঠির ভিত্তিতে কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? মধ্যরাতে পদোন্নতির মতো সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে প্রকাশ না করার কারণ কী? জ্যেষ্ঠতা ও মেধার বদলে কি অন্য কোনো বিবেচনা এখানে প্রাধান্য পেয়েছে?
প্রশাসন ও সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে,
পদোন্নতি যদি স্বচ্ছ, নিয়মতান্ত্রিক ও সময়োপযোগী না হয়, তাহলে তা পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর আস্থা নষ্ট করে।একজন সাবেক শীর্ষ আমলা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
মধ্যরাতে পদোন্নতি আর ওয়েবসাইটে তথ্য না দেওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিক নয়। এতে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
এ বিষয়ে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
সব পদোন্নতি বিধি-বিধান অনুসরণ করেই দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু বিষয় প্রশাসনিক কারণে প্রকাশে দেরি হতে পারে।তবে এই ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট মহলের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না বলেই মত বিশ্লেষকদের।
শুল্ক ক্যাডারের এই মধ্যরাতের পদোন্নতি শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার ক্যারিয়ার অগ্রগতির বিষয় নয়—এটি এনবিআরের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়ে আস্থা ফেরাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।