অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Dec 18, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস: ঘুষের অভিযোগে জনবান্ধব সেবা প্রশ্নের মুখে

নিজস্ব অনুসন্ধান

সরকারি সেবা খাতে জনবান্ধব দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেই অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা কার্যকর—তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। সেবা প্রত্যাশী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই অফিসে ঘুষ ও দালাল ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

একাধিক আবেদনকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি এই দপ্তরটি ধীরে ধীরে একটি “ব্যক্তিগত সেবা বাণিজ্য কেন্দ্রে” পরিণত হয়েছে—যেখানে নিয়মের চেয়ে অঘোষিত লেনদেনই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, দালালের সহায়তা ছাড়া সরাসরি আবেদন করলে শুরু হয় নানা ধরনের হয়রানি। কখনো কাগজপত্রে তুচ্ছ ভুল দেখিয়ে আবেদন বাতিল করা হয়, কখনো নতুন করে ফাইল জমা দিতে বলা হয়। এক ধাপ পার হলে আরেক ধাপে নতুন অজুহাত—শেষ পর্যন্ত আবেদনকারী মানসিক ও আর্থিক চাপে দালালের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন।

ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা কয়েকজন আবেদনকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“আমরা একেকজন একেক জায়গা থেকে আসি। একা প্রতিবাদ করলে শুধু হয়রানি বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ঘুষ না দিলে পাসপোর্ট পাওয়া যায় না—এটাই বাস্তবতা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অফিসের ভেতরেই একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে—এমন অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, অফিস সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির ছত্রছায়ায় এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে।

সূত্র জানায়, কথিত ‘রহিম’ নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়। দালালদের মাধ্যমে জমা দেওয়া আবেদনপত্রে বিশেষ চিহ্ন বা কোড ব্যবহার করা হয়—যা কেবল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও চক্রের সদস্যরাই শনাক্ত করতে পারেন। সাধারণ আবেদনকারীদের পক্ষে এই প্রক্রিয়া বোঝা সম্ভব নয়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয় এবং মাসে তা কোটি টাকার ঘরে পৌঁছায়—যদিও এসব দাবির স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক (ডিডি) শাহ মুহাম্মদ ওয়ালি উল্লাহ এবং উপ-সহকারী পরিচালক (এডি) মুহাম্মদ জামাল উদ্দিনের জ্ঞাতসারেই দালাল চক্রটি সক্রিয় রয়েছে।
এছাড়া অফিসের সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. রফিকুল ইসলাম এবং রেকর্ড কিপার দেবাশীষ দাস আবেদন ব্যবস্থাপনা ও অর্থ বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত—এমন অভিযোগও উঠেছে।

তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, এসব অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে আসছে।

আরও উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে—এই অফিস থেকে নাকি কিছু স্থানীয় সাংবাদিককে নিয়মিত অর্থ দেওয়া হয়, যাতে দুর্নীতির খবর প্রকাশ না পায়। ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ প্রকাশ্যে আসার আগেই চাপা পড়ে যায়—এমন অভিযোগ করছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তবে এই দাবিরও স্বাধীন যাচাই করা যায়নি।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয় এই পাসপোর্ট অফিসের পাশের ভবনেই অবস্থিত। তবুও এতদিন ধরে চলমান অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—
“দুদকের চোখে কি কিছুই পড়েনি?”

দুদকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, পাসপোর্ট ইস্যু প্রক্রিয়ায় কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ নেই। নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে যে কোনো নাগরিক সরাসরি আবেদন করতে পারেন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা সেই ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক—এমন অভিযোগ করছেন সেবা প্রত্যাশীরা।


সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাসপোর্ট অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতে যদি দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চলে, তাহলে তা কেবল ব্যক্তি নয়—পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।
তাদের মতে, কার্যকর নজরদারি, হটলাইন, গোপন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং দৃশ্যমান শাস্তি ছাড়া এ ধরনের সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়।


স্থানীয় সচেতন মহল ও নাগরিক সমাজের দাবি, অভিযোগগুলো দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে। দোষী প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া উচিত নয়।
তাদের ভাষায়,
“রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই বার্তাটি স্পষ্ট হতে হবে।”

সরকারের শীর্ষ পর্যায় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে হয়তো ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে দুর্নীতির এই অধ্যায় একদিন মুছে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কুমিল্লায় শিশু সায়মন হত্যা মামলা একজনের মৃত্যুদণ্ড অপরজনের য

1

ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার ভয়াবহ হামলা

2

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে জমি কেলেঙ্কারি: ওবায়দুল কাদেরসহ ১৪ জনে

3

ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে জামায়াত আমিরের বৈঠক

4

সুনামগঞ্জ-৩ আসনে আলোচনায় বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থী আব্দুল ছ

5

সোশ্যাল মিডিয়ায় জুয়া: তরুণ প্রজন্মের নীরব শিকার

6

গাজীপুরে ককটেল বিস্ফোরণ, বিকাশ ব্যবসায়ীর আড়াই লাখ টাকা ছিনতা

7

মেহেরবানি করে চাঁদাবাজি করবেন না, রাজশাহীতে কর্মী সম্মেলনে জ

8

ডিএনএ আবিষ্কারক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন আর নেই

9

কুমিল্লায় ১১৯০ পিস ইয়াবাসহ স্বামী-স্ত্রী আটক, নগদ ৩ লাখ ৩১

10

ফেসবুকে 'অর্গানিক' ও '১০০% গ্যারান্টি' দাবির আড়ালে বিপজ্জনক

11

সায়েদাবাদ ও গুলিস্তানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ১০০ বাস কাউন্টার

12

“ন্যায় চাই, সালমান শাহর হত্যার বিচার চাই”—সারাদেশে গর্জে উঠল

13

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বানভাসি ১২'শ পরিবারের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিত

14

মহাখালীর বস্তিতে আগুন : ৫ ইউনিটের চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে

15

রাজধানীতে প্রকাশ্য গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ: আতঙ্কে নগরবাসী, তদ

16

পাকিস্তানের তিন নদীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি, পাঞ্জাবে উচ্চ

17

ইবিএল-এর দাবি, ৫০ কোটি টাকার ঋণ এখন দ্বিগুণ’ সূত্র জানায়, প্

18

ডেটা ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ: দু’টি অধ্যাদেশ জারি

19

সন্ত্রাসবাদীদের ‘মৃত্যুদণ্ড' বিল ইসরাইলি সংসদে পাস

20