উদয়ের পথে
ঢাকার মহাখালী এলাকায় স্বাস্থ্য খাতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে সংস্কার ও আধুনিকায়ন কাজের নামে অনিয়ম, অতিরিক্ত বরাদ্দ আদায় ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী আমান উল্লাহ সরকার।
অনুসন্ধানে পাওয়া নথি ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের রাজস্ব বাজেটের আওতায় বিভিন্ন ভবন নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ১০ কোটি ৮১ লাখ টাকা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বরাদ্দ এনে সেই অর্থের একটি অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।
তথ্য বলছে, ঢাকা মহাখালীস্থ জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) এবং বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (বিএমআরসি)—এই তিনটি প্রতিষ্ঠানে একাধিক ছোট ও মাঝারি সংস্কার প্রকল্প দেখানো হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের বি-ব্লকের ৭ম তলায় অ্যালুমিনিয়াম পার্টিশন দিয়ে কক্ষ নির্মাণ, নতুন টয়লেট স্থাপন, টাইলস ও স্যানিটারি লাইনের সংস্কার।
বি-ব্লকের নিচতলায় অক্সিজেন সরবরাহের জন্য ম্যানিফোল্ড কক্ষ নির্মাণ,বি ও ডি ব্লকের মাঝখানে বৃক্ষলিপি স্থাপনা গেট, রাস্তা নির্মাণ ও মাটি ভরাট,সি-ব্লকের অপারেশন থিয়েটারের দেয়াল, টাইলস, দরজা–জানালা ও স্যানিটারি ফিটিংস নবায়ন,আইএইচটি এলাকায়—২য় শ্রেণির কর্মচারীদের আবাসিক ভবনের বাউন্ডারি ওয়াল উঁচু করা ও গেট নির্মাণ,শরীফ মোহাম্মদ হল ও ছাত্রী হোস্টেলের দরজা–জানালা, গ্রিল, টাইলস, স্যানিটারি ব্যবস্থা সংস্কার,
এছাড়া বিএমআরসি ভবনে চেয়ারম্যানের কক্ষ ও বাথরুম সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধনের নামে পুল নির্মাণ, ভিনিশিয়ান ব্লাইন্ড স্থাপন এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর প্রাঙ্গণে ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড, টয়লেট, স্টোররুম ও বাগান তৈরির কাজ দেখানো হয়েছে।স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ভেতরের একটি সূত্র জানায়, একাধিক কাজ এমন ছিল, যেগুলো জরুরি নয় বা খুবই সীমিত সংস্কারেই করা যেত। কিন্তু সেগুলো বড় প্রকল্প হিসেবে দেখানো হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রকৌশলী বলেন,মন্ত্রণালয়ে সরাসরি তদবির করে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বরাদ্দ আনা হয়েছে—এমন অভিযোগ আমরা শুনেছি।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কাজ নিজস্ব ৩–৪ জন পছন্দের ঠিকাদারকে দেওয়া হয়। আরও অভিযোগ রয়েছে
কাজের বিলের চেক ঠিকাদারদের হাতে না গিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসায় পৌঁছে দেওয়া হতো।কাজের গুণগত মান যাচাই না করেই বিল ছাড় করা হয়েছে,এক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,আমাদের বলা হয়েছিল, কাজ পেলেই নির্দিষ্ট অংশ ‘ম্যানেজ’ করতে হবে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু স্থানে কাজ আংশিক হয়েছে, আবার কিছু জায়গায় সংস্কারের চিহ্ন খুবই সীমিত। অথচ নথিতে দেখানো হয়েছে পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন।একজন হাসপাতাল কর্মকর্তা বলেন,কাগজে যা দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার অনেকটাই চোখে পড়ে না।
দুর্নীতি দমন কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। প্রাথমিক যাচাই শেষে প্রয়োজন হলে অনুসন্ধান শুরু করা হবে।
সরকারি ক্রয় ও নির্মাণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ছোট সংস্কার প্রকল্পে অনিয়ম তুলনামূলক সহজ।একজন সুশাসন বিশ্লেষক বলেন,সংস্কার কাজগুলো সাধারণত কম নজরদারির মধ্যে থাকে। এখানেই অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো বা একই কাজ বারবার দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের একাধিক গবেষণায়ও দেখা গেছে, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাত দুর্নীতির ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর একটি।
এই সব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী আমান উল্লাহ সরকারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।