স্টাফ রিপোর্টার |
প্রজ্ঞাপনগুলো একটির পর একটি আসছে—তারিখে অল্প ফারাক, ভাষা প্রায় একই। কারণও এক—পারিবারিক সমস্যা’। অথচ সরকারি নিয়ম বলছে, কোনো কর্মকর্তা একটি পদে দুই বছর পূর্ণ না করলে তাকে বদলি করা যাবে না। কিন্তু ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার একাধিক সরকারি খাদ্য গুদামে দেখা যাচ্ছে ঠিক তার উল্টো চিত্র। তথ্য বলছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একদল কর্মকর্তাকে সরিয়ে, মোটা অঙ্কের বিনিময়ে নতুনদের বসানো হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে—এই বদলি বাণিজ্যের মূল হোতা ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলমের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। মধ্যস্থতা করছেন খাদ্য পরিদর্শক মো. মাজহারুল ইসলাম কামাল। সরকারি চাকরিতে বদলি–পদায়ন বরাবরই সংবেদনশীল ইস্যু। কিন্তু এবার যা ঘটছে, সেটি অনেকের ভাষায় এক ধরনের প্রকাশ্য বাণিজ্য।
বদলি–পদায়নের নথিপত্র: সূত্র যা জানায়
প্রাপ্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় অন্তত ছয়জন খাদ্য পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বদলি করা হয়েছে। দুইটি প্রজ্ঞাপনের নম্বর— ১৩.০১.০০০০.০০০.০০০.১৯.০০০৪.২২.৭১৭ (তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫) ১৩.০১.০০০০.০০০.০০০.১৯.০০০৪.২২.৭৪০ (তারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫)।
উভয় প্রজ্ঞাপনেই স্বাক্ষর করেছেন আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আশরাফুল আলম।
দুদক সূত্র জানায়, এই প্রজ্ঞাপন দুটি “প্যাটার্নড বদলি”–এর নিদর্শন—যেখানে একদল কর্মকর্তাকে আগেভাগে সরিয়ে অন্যদের বসানো হয়েছে ব্যক্তিগত আর্থিক চুক্তির ভিত্তিতে। খাদ্য অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে ‘পারিবারিক সমস্যা’ শুধু অজুহাত। আগে থেকেই ঠিক থাকে কার কোথায় যাবে। একেকটা পদে বসার দাম ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ওঠে। টাকা না দিলে ফাইল নড়ে না।
ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় ছয় বদলি, ছয় গল্প
তথ্য বলছে, বদলি প্রক্রিয়াটি যেন এক ধরনের নীরব নেটওয়ার্ক।
তারাকান্দা গুদাম: ১৯ আগস্ট ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলাল হোসেনকে মেয়াদ শেষের ২৫ দিন আগেই সরানো হয় ‘পারিবারিক সমস্যা’ দেখিয়ে। তার জায়গায় বসানো হয় শাকিল আহমেদকে।
গৌরীপুর গুদাম: ১৪ সেপ্টেম্বর বোরহান উদ্দিনকে বদলি করে পদায়ন করা হয় আলাল হোসেনকে—যিনি এর আগেও তারাকান্দা থেকে একই অজুহাতে সরে গিয়েছিলেন।
শ্যামগঞ্জ গুদাম: ৯ সেপ্টেম্বর আবদুল কাইয়ুমকে সরিয়ে বসানো হয় সাজ্জাদ হোসেন খান পাঠানকে—মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই মাস পাঁচ দিন আগেই। ধলা গুদাম, ত্রিশাল: ২৮ সেপ্টেম্বর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদকে সরিয়ে দেওয়া হয় তিন মাস বাকি থাকতেই; তার জায়গায় আসেন হিমেল চন্দ্র সরকার।
ঠাকুরাকোনা গুদাম, নেত্রকোনা: একই তারিখে শামীম আহমেদকে সরিয়ে পদায়ন করা হয় আবদুল ওয়াহাবকে। নেত্রকোনা সদর: ৩০ অক্টোবর কাইয়ুম মোহাম্মদকে সরিয়ে বসানো হয় রেজাউল ইসলামকে।
অভিযোগ উঠেছে, এই বদলিগুলোর পেছনে ‘সাজানো আবেদনপত্র’ আছে—যেখানে কর্মকর্তাদের জোর করে পারিবারিক সমস্যার কথা লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে। একজন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,
আমাদের বলা হয়েছিল—‘আবেদন দাও, না হলে সমস্যা হবে’। আমরা বাধ্য হয়ে লিখেছি। পরে শুনলাম, অন্যজন পদটা নিয়েছে ১২ লাখ টাকায়।
অফিস কপি লুকানো হয়েছে
আরেকজন জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, যে প্রজ্ঞাপন অফিসে থাকার কথা, সেটি অনেক সময় ফাইলে রাখা হয় না। কারণ লেনদেনের বিষয়টা গোপন রাখতে হয়। শুধু সিন্ডিকেটের ভেতরেই কপি ঘোরে।এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
একজন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলেন,
নিয়ম মানা হচ্ছে না। নীতিমালায় স্পষ্ট বলা—দুই বছর পূর্ণ না হলে বদলি নয়। কিন্তু এখানে দুই মাস বাকি থাকলেই বদলি হচ্ছে।
সিন্ডিকেটের ছায়া: কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেটটি মূলত তিন স্তরে কাজ করে—
আঞ্চলিক স্তরে পরিকল্পনা: ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয়ে প্রাথমিক তালিকা তৈরি হয়।
মধ্যস্থতা: খাদ্য পরিদর্শক মাজহারুল ইসলাম কামাল যোগাযোগের ভূমিকা রাখেন।
নথি প্রস্তুতি ও অনুমোদন: আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেন হয় ব্যক্তিগত অনুদান,বা,সহযোগিতা, হিসেবে। কোনো ব্যাংক চ্যানেলে নয় সরাসরি নগদে বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে খাদ্য পরিদর্শক মো. মাজহারুল ইসলাম কামাল বলেন,
স্যার (আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক) সচরাচর সাংবাদিকদের কল ধরেন না। তিনি আমাকে জানিয়েছেন সাংবাদিক কল করেছিলেন। অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেউ কেউ অহেতুক নাম ঘুরাচ্ছে। শামীম নিজে থেকেই বদলির আবেদন করেছিল। তিনি আরও বলেন, আমরা নিয়ম মেনেই কাজ করি। কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত কারণ ছিল, তারাই আবেদন করেছে। এসব গল্প বানিয়ে আমাদের বদনাম করার চেষ্টা হচ্ছে।
আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আশরাফুল আলমের ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে কল দেখে তিনি বিষয়টি পরিদর্শক মাজহারুল ইসলামকে জানান বলে জানা গেছে।
তদন্ত ছাড়া মন্তব্য নয়
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীরের মোবাইলফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে খাদ্য সচিব প্রশ্নের জবাবে বলেন,
নীতিমালা অনুযায়ী, একজন কর্মকর্তা দুই বছর পূর্ণ না হলে বদলি করা যাবে না। আবার একসঙ্গে এত কর্মকর্তার ‘পারিবারিক সমস্যা’ হওয়াটাও বাস্তবসম্মত নয়। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদক বলছে: অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্যপ্রমাণিত
দুদকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান,আমরা কয়েকটি প্রজ্ঞাপনের কপি সংগ্রহ করেছি। একই ভাষা, একই যুক্তি, একই স্বাক্ষর—এগুলো একটা ধরণের সিস্টেমেটিক বদলির ইঙ্গিত দেয়। প্রাথমিক অনুসন্ধান চলছে। তিনি আরও বলেন, এমন ঘটনা শুধু ময়মনসিংহেই নয়—দেশের অন্যান্য বিভাগেও আছে। তবে ময়মনসিংহ–নেত্রকোনায় বিষয়টা বেশি দৃশ্যমান।
দুর্নীতির নতুন ধরন
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞ ড. ফারহানা হক বলেন,এই ধরণের বদলি বাণিজ্য সরকারি ব্যবস্থাপনাকে ভিতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজন কর্মকর্তা যদি ঘুষ দিয়ে পদে বসেন, তিনি সেই টাকাটা তোলার চেষ্টা করবেন। ফলে নীতিমালা, সেবা, গুণগত মান—সবকিছুই প্রভাবিত হয়।
তার মতে, আগে বদলি হতো রাজনৈতিক চাপে। এখন সেটা ‘অফিসভিত্তিক সিন্ডিকেট’–এর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
পরিসংখ্যান যা বলছে
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলায় প্রায় ১,৮০০ সরকারি খাদ্য গুদাম (LSD ও CSD) আছে। এসব গুদামে কর্মরত প্রায় ৫,২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী।
২০২৪ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছর গড়ে ৪০–৫০ শতাংশ বদলি আগাম করা হয়—যার বড় অংশেই “ব্যক্তিগত কারণ” উল্লেখ থাকে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন,+ব্যক্তিগত কারণের অজুহাতটা এখন দুর্নীতির কভার টার্ম হয়ে গেছে। একজন সরানো কর্মকর্তা বলেন, আমি পরিবার নিয়ে ভালোই ছিলাম। অফিস থেকে বলা হলো, তুমি আবেদন দাও। না হলে অন্য জায়গায় ট্রান্সফার দেওয়া হবে খারাপ পোস্টে। কিছু করার ছিল না।
অন্য একজন কর্মকর্তা বলেন, ঘুষ দিতে পারিনি, তাই বদলি হয়ে গেলাম। আমার জায়গায় যিনি এলেন, তিনি ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন বলে সবাই বলছে।
প্রশাসনিক নীতির ছেঁড়াখোঁড়া
খাদ্য অধিদপ্তরের ২০১৯ সালের বদলি নীতিমালার ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে—কোনো কর্মকর্তা দুই বছর পূর্ণ না করলে, বিশেষ কারণ ব্যতীত, তাকে বদলি করা যাবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনগুলো দেখলে বোঝা যায়—‘বিশেষ কারণ’ এখন একটাই—পারিবারিক সমস্যা।
একজন সিনিয়র সেকশন অফিসার বলেন, এই ‘পারিবারিক সমস্যা’ আসলে একটা কোডওয়ার্ড। বোঝায় টাকা দেওয়া আছে, তাই তাড়াতাড়ি বদলি হবে।
সরকারি প্রশাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহবুব আলম বলেন,
বদলি বাণিজ্য প্রশাসনিক দুর্নীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ। এটা বন্ধ না করলে মাঠ পর্যায়ের সেবা কাঠামো ভেঙে পড়বে।তিনি সুপারিশ করেন—বদলি নীতিমালা হালনাগাদ করে ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করা, ‘ব্যক্তিগত কারণ’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যাচাই কমিটি গঠন,আঞ্চলিক অফিসগুলোর আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা।
বদলির আড়ালে অবিশ্বাসের বীজ
নেত্রকোনার ঠাকুরাকোনা খাদ্য গুদামের এক কর্মচারী বলেন,আমরা এখন বদলি আদেশকে ভয় পাই। কে জানে, কাল কাকে কোথায় পাঠাবে! এই ভয়টাই এখন সবচেয়ে বড় সংকেত—একটা অস্বচ্ছ প্রশাসনিক বাস্তবতা, যেখানে নীতি ও নীতিমালা দুটোই হারিয়ে যাচ্ছে কাগজের ভাঁজে।
প্রশাসনিক নিয়মের বাইরে বদলি শুধু দুর্নীতি নয়, এটা রাষ্ট্রীয় আস্থার ক্ষয়। সরকারি নথির প্রতিটি শব্দ—পারিবারিক সমস্যা—এখন যেন এক নতুন কোড, যার মানে ঘুষ, প্রভাব ও প্রহসন।
প্রশ্ন উঠছে—কবে এই বদলির সিন্ডিকেটের ওপর নেমে আসবে সত্যিকারের বদল?