বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মরত অন্তত ৩৬ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, জাল দলিল প্রস্তুত ও সরকারি রাজস্ব ফাঁকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এদের অনেকেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও জাল শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্র ব্যবহার করে সরকারি চাকরি নিয়েছেন—যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় তদারকি নিয়ে।
তথ্য বলছে, অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রারদের জন্মসনদ অনুযায়ী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের বয়স ছিল মাত্র ৩ থেকে ৬ বছর। অথচ অভিযোগ রয়েছে, তারা নিজেদের মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী পরিচয়ে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করেন।
একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
এই বয়সে কারও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। অথচ সেই পরিচয় ব্যবহার করে কেউ সরকারি চাকরি পেলে সেটি রাষ্ট্রীয় জালিয়াতির শামিল।
সূত্র জানায়, অভিযুক্ত এই ৩৬ জন সাব-রেজিস্ট্রার দীর্ঘদিন ধরে দলিল নিবন্ধনের নামে ঘুষ বাণিজ্য, জাল দলিল প্রস্তুত এবং রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছেন।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সরকারি কোষাগারে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।বিশেষ করে বরিশাল বিভাগে কর্মরত চার সাব-রেজিস্ট্রার—
পটুয়াখালীর খেপুপাড়া: কাজী নজরুল ইসলাম,বরিশাল সদর: অসীম কল্লোল,ভোলার লালমোহন: মঞ্জুরুল ইসলাম,পটুয়াখালী সদর: মোহাম্মদ ফারুক।
—এই চারজনের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচারের তথ্য পেয়েছেন অনুসন্ধানকারীরা। তথ্য অনুযায়ী, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ কলকাতা, দুবাই ও কানাডার টরন্টোর তথাকথিত ‘বেগমপাড়া’য় পাচার করা হয়েছে। দেশের ভেতরে সেই অর্থ দিয়ে স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজনের নামে প্লট, ফ্ল্যাট, মাছের ঘের, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা নিজেদের নামে আয়কর ফাইল খুলে সীমিত আয়ের হিসাব দেখালেও, প্রকৃত সম্পদের মালিকানা পরিবারের সদস্যদের নামে ভাগ করে রাখা হয়েছে—যা অর্থ পাচার ও দুর্নীতি আড়াল করার একটি পরিচিত কৌশল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বরিশাল ও পটুয়াখালীর একাধিক দলিল গ্রহীতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
ঘুষ না দিলে দলিল আটকে রাখা হয়। অনেক সময় ভয় দেখানো হয়—কাগজে সমস্যা দেখিয়ে মামলা ঝুলিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। একজন প্রবীণ দলিল লেখক বলেন,এখানে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না—এটা এখন ওপেন সিক্রেট।
সুশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো দুর্নীতির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি। এখানে জালিয়াতি হলে শুধু রাজস্ব নয়, মানুষের জমি-সম্পত্তির নিরাপত্তাও হুমকিতে পড়ে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
নিয়োগ পর্যায় থেকেই যদি ভুয়া সনদ ঢুকে পড়ে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে যায়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেন,
সাব-রেজিস্ট্রি খাতে দুর্নীতির অভিযোগ আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখি। নির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য পেলে তদন্তের সুযোগ রয়েছে।তিনি আরও জানান,কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।
প্রশ্ন উঠছে
এই ঘটনায় একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—কীভাবে এত কম বয়সে মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাওয়া সম্ভব হলো?
নিয়োগের সময় এসব সনদ যাচাই করা হয়েছিল কি না?দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
ভুয়া সনদ, ঘুষ ও জাল দলিলের অভিযোগে অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তদন্ত শুধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, পুরো ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য জরুরি।