অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Dec 20, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

হাদী হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কে? আলোচনায় কেরানীগঞ্জের প্রভাবশালী সাবেক চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ

বিশেষ প্রতিনিধি

ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জে আলোচিত হাদী হত্যাকাণ্ড ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে প্রভাবশালী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহীন আহমেদের ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী পরিবার, ভূমি-সংক্রান্ত নথি এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আলোচিত এই নেতার নাম হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে উঠে আসছে।

যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আদালত শাহীন আহমেদকে দোষী সাব্যস্ত করেনি, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক সূত্র জানায়, তার আর্থিক উত্থান, ক্ষমতার বিস্তার এবং সহিংস ঘটনার ধারাবাহিকতা নতুন করে তদন্তের দাবি জোরালো করেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহীন আহমেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্থান শুরু হয় ২০০০ সালের শুরুর দিকে। কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর ঘাটে ট্রলার থেকে চাঁদা তোলা এবং ঢাকা–মাওয়া রুটে বাসের কন্ডাক্টরের কাজ করার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলে ২০০৯ সালে তিনি কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে দায়িত্ব নেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির। এরপর টানা প্রায় ১৬ বছর কেরানীগঞ্জে তার একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
একজন স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে কেরানীগঞ্জে কোনো বড় সিদ্ধান্ত তার অনুমতি ছাড়া হতো না। জমি বিক্রি, হাউজিং, এমনকি নদীর ঘাট—সবকিছুতেই তার প্রভাব ছিল।

তথ্য বলছে, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বালু ভরাট করে শিল্প ও আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শাহীন আহমেদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা জানান, নদীর সীমানা পিলার সরানো, খাল ভরাট এবং খাস জমি দখলের বিষয়ে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন ছিল।
একজন সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) বলেন,খাস জমি উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তা সম্ভব হয়নি।

ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চল ও আবাসন প্রকল্পের নামে শত শত একর ফসলি জমি নামমাত্র মূল্যে কিনতে বা জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে মামলা, হুমকি কিংবা সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার অভিযোগও রয়েছে। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে শাহীন আহমেদ ও তার স্ত্রীর ঘোষিত সম্পদ কয়েকগুণ বেড়েছে। জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়।

দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,আমরা হলফনামার তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখতে পাচ্ছি। বিষয়টি যাচাইয়ের আওতায় রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ঘোষিত সম্পদের বাইরেও তার নামে ও বেনামে দেশ-বিদেশে আরও সম্পদ থাকতে পারে—যা তদন্তসাপেক্ষ।

হাদী হত্যাকাণ্ড: প্রশ্ন কোথায়

হাদী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে শাহীন আহমেদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখনো আদালতে উপস্থাপিত হয়নি। তবে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, নিহত ব্যক্তি আগে জমি ও চাঁদাবাজি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন।এক ভুক্তভোগী আত্মীয় বলেন,হাদী বারবার বলত, সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যাবে। কিন্তু এখানে প্রতিবাদ করলে কী হয়, সবাই জানে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সহিংসতা—এই তিনের যোগসূত্র না খুঁজে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ বের করা কঠিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে একক ক্ষমতা থাকলে সহিংসতা ও অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে ভূমি ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে স্বচ্ছতা না থাকলে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটার পেছনে কাঠামোগত কারণ কাজ করে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তই একমাত্র পথ।


দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্র জানায়, শাহীন আহমেদের সম্পদ, ভূমি দখল এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ প্রাথমিক যাচাইয়ের তালিকায় রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে।একই সঙ্গে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলমান। কাউকে আগেভাগে দোষী বলা যাবে না, তবে সব সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে

কেরানীগঞ্জে প্রভাব, সম্পদ ও সহিংসতার অভিযোগে দীর্ঘদিন আলোচিত শাহীন আহমেদ এখন নতুন করে জাতীয় আলোচনায়। হাদী হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত নেপথ্য উদঘাটন হবে কি না, তা নির্ভর করছে স্বাধীন তদন্ত, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর।



মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ড্যাপ সংশোধনে ঐতিহাসিক গতি: রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামে

1

‘ডজি ডন ইজ ব্যাক’—নিউসোমের টুইট ঘিরে ট্রাম্পবিরোধী বিতর্ক

2

রূপসায় ২০০ একর জমি দখল করে ইটভাটার ব্যবসা

3

ব্যাটিংয়ে সাকিব আবারও ব্যর্থ, বল হাতে ১ উইকেট

4

জুলাই গণঅভ্যুত্থান গণতান্ত্রিক চর্চার পথ নতুন করে খুলে দিয়েছ

5

সোনালী আঁশে সাফল্যের হাতছানি নাগরপুরে!

6

ডেমুর পর এবার লাগেজ ভ্যান: ৩৫৮ কোটি টাকার প্রকল্পে ভরাডুবি

7

শিশু মমতা হত্যার বিচার দাবিতে স্বজন ও এলাকাবাসীর মানববন্ধন ও

8

আবাসিক প্লট ও ফ্ল্যাট হস্তান্তরে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নতুন ন

9

রোহিঙ্গাদের জাহাজে তুলে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছে ভারত

10

খুলনার লতা ব্রিজ এলাকায় যুবককে গুলি করে পালাল দুর্বৃত্তরা

11

বেনাপোলে কসাই হত্যাকাণ্ড: প্রশ্নের চেয়ে উত্তর কম

12

১৭ বছর পর দেশে ফিরছেন তারেক রহমান, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই

13

৮০ কোটি টাকা কমিশন ডিসি-এসপির দপ্তরে

14

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন নিয়োগ বিধিমালা,

15

রাশিয়া ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্রুততর করতে যৌথ ট্রান্স

16

পাঠ্যপুস্তক ক্রয় প্রক্রিয়ার সময়সীমা হ্রাসের প্রস্তাব অনুমোদন

17

হাবিপ্রবিতে ঘুষের অডিও ফাঁস

18

কুশারিয়া ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৫: টিম সাগরের বিজয় উল্লাস

19

‘আমি ভয়ও পাচ্ছি, কারণ ইসরায়েলিদের বিশ্বাস করি না’

20