ঢাকা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা খালের পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকার অদূরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বুক চিরে বয়ে গেছে ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ শুভাঢ্যা খাল। একসময় নৌযান চলত, কৃষিজমির সেচের পানি আসত, আর পাওয়া যেত নানা জাতের মাছ। কিন্তু দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ আজ প্রায় মৃতপ্রায়।
তথ্য বলছে, গত দুই দশকে খালটিকে পুনরুদ্ধারের নামে একাধিকবার কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো ফল পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলছেন—বারবার কোটি কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হলেও খালে কেন এখনো পানি ফিরল না?
প্রকল্পের ইতিহাস: ব্যয়ের অঙ্ক, ফলাফল শূন্য :
সূত্র জানায়, শুভাঢ্যা খাল উদ্ধারে প্রথম বড় উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০৭সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। সে সময় তিন কিলোমিটার এলাকায় ১৮৬টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল। খালের পানি প্রবাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও কয়েক বছরের মধ্যে আবার ভরাট হয়ে যায়।
এরপর ২০১২ সালে উপজেলা প্রশাসন প্রায় ৫৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়, তবে এর প্রভাব স্থায়ী হয়নি। ২০১৫ সালে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিল থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে খালের দুই তীরে ব্লক বসানো হয়। তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হলেও কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।
২০২৩ সালে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ৭ কোটি টাকার খননকাজ উদ্বোধন করেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ—“বরাদ্দের টাকা মাঠে কাজে লাগেনি, বরং লুট হয়েছে।
নতুন করে ৩১৭ কোটি টাকার প্রকল্প
সবশেষে, চলতি বছর অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দিয়ে ৩১৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে খালটির পুনর্খনন ছাড়াও পরিকল্পনায় রয়েছে—পাড় বাঁধাই, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৃক্ষরোপণ। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, “ভূমিদস্যুদের কারণে খালের অস্তিত্ব সংকট তৈরি হয়েছে। এবার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”
অন্যদিকে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, “শুভাঢ্যা খালকে আবার বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর সঙ্গে সংযুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে, নৌ চলাচল ফিরবে।
বারবার উদ্বোধন, কিন্তু কেন ব্যর্থতা?
প্রশ্ন উঠছে—এতগুলো প্রকল্পের উদ্বোধনের পরও কেন টেকসই ফলাফল আসছে না?
স্থানীয়রা বলছেন, “প্রতিবার খনন করে মাটি ও বর্জ্য খালের পাড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। বর্ষার পানিতে সব আবার খালে ফিরে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পুনর্খনন নয়—প্রয়োজন দখলদার উচ্ছেদ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা। নইলে আবারও কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও পূর্বের মতো ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
সামাজিক আন্দোলনের ডাক
তথ্য বলছে, খালের দুই পাড়ে এখনো অনেক অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা—দখলদার উচ্ছেদ না হলে এই প্রকল্পও ব্যর্থ হতে পারে।
৬০ বছরের বাসিন্দা তৈয়ব আলী বলেন, “কতবার শুনলাম খাল খনন হবে। কোটি কোটি টাকা খরচ হলো। তবুও খালে পানি আসে না। এবার যদি কিছু একটা হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুভাঢ্যা খাল রক্ষা এখন শুধু প্রকল্পের বিষয় নয়—এটি সামাজিক আন্দোলনের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে : আগের ব্যর্থতার মতো কি এবারও কোটি কোটি টাকা খরচ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
নাকি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে শুরু হওয়া নতুন উদ্যোগ সত্যিই শুভাঢ্যা খালের প্রাণ ফিরিয়ে আনবে?