স্টাফ রিপোর্টার
ঈশ্বরদীতে ইউনাইটেড টোব্যাকো কারখানায় ভ্যাট গোয়েন্দার অভিযান: প্রায় ৯ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির আলামত, প্রশ্ন উঠছে নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে
ঈশ্বরদীর ইউনাইটেড টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজের একটি কারখানায় বিশেষ অভিযানে প্রায় ৯ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গোপন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) পরিচালিত এই অভিযানের বিষয়টি এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইউনাইটেড টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজ ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ করলেও দীর্ঘদিন ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উৎপাদন কার্যক্রম প্রদর্শন না করে গোপনে সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছিল। তথ্য বলছে, এই গোপন উৎপাদনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া।
ভ্যাট গোয়েন্দার অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৫৯০ শলাকা জাল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট, যার বাজারমূল্য ৩৮ লাখ টাকার বেশি। এসব সিগারেটের বিপরীতে প্রায় ২৯ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির আলামত পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
সূত্র জানায়, কারখানাটি থেকে আরও ১০ লাখ ২৯ হাজার অব্যবহৃত জাল ব্যান্ডরোল বা স্ট্যাম্প জব্দ করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, এই জাল স্ট্যাম্পগুলো ব্যবহার করা হলে সরকারের অতিরিক্ত সাড়ে ৮ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—প্রতিষ্ঠানটি আইনগতভাবে ৩ লাখ ২২ হাজার ৫০০টি বৈধ ব্যান্ডরোল সংগ্রহ করলেও সেগুলো ব্যবহার না করে জাল ব্যান্ডরোলের মাধ্যমে সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করছিল। এতে করে রাজস্ব ফাঁকির পাশাপাশি ব্যান্ডরোল জালিয়াতির একটি সুসংগঠিত চক্রের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ভ্যাট গোয়েন্দা সূত্র জানায়, উদ্ধার করা সিগারেট, জাল ব্যান্ডরোল ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জব্দ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ও শুল্ক আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এই অভিযান কেবল শুরু—রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট চক্রগুলোকে আইনের আওতায় আনতে আরও বিস্তৃত তদন্ত চলবে।
অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের জাল ব্যান্ডরোল ও গোপন উৎপাদন রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য একটি মারাত্মক হুমকি। তাঁদের ভাষায়, “একটি প্রতিষ্ঠান যখন বৈধ ব্যান্ডরোল সংগ্রহ করেও তা ব্যবহার না করে জাল স্ট্যাম্পে উৎপাদনে যায়, তখন সেখানে কেবল ব্যক্তিগত লাভ নয়—একটি সুসংগঠিত অপরাধমূলক সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা তৈরি হয়।”
তাঁদের মতে, নিয়মিত নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার না করলে এ ধরনের রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করা কঠিন।
এই ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মিত তদারকি কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে গোপন উৎপাদন চলতে থাকলে তা কীভাবে নজরের বাইরে রইল—এই প্রশ্নের জবাব খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।
এনবিআর বলছে, অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চূড়ান্ত তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি দোষী—এমন সিদ্ধান্তে না পৌঁছে সতর্ক ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।