নিজস্ব প্রতিবেদন খুলনা
খুলনার নতুন জেলা কারাগার নির্মাণ প্রকল্প—একসময় যেটিকে বলা হয়েছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নিরাপত্তা ও মানবিক পুনর্বাসনের আধুনিক প্রতীক—আজ সেটি আলোচনায় এসেছে ভিন্ন কারণে।
তথ্য বলছে, ২০১১ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালে, কিন্তু ১৩ বছর পেরিয়েও কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। বাজেট বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি; সময় বাড়ানো হয়েছে পাঁচ দফায়।
সূত্র জানায়, এই প্রকল্প ঘিরে বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম, বিলম্ব, এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ঘুরছে প্রশাসনিক মহলে। প্রশ্ন উঠছে—যে প্রকল্পটি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা কেন এত ধীরগতিতে এগোল? কারা লাভবান হলো এই বিলম্ব থেকে?
প্রকল্পের সূচনা ও কাঠামো :
খুলনা জেলার নতুন কারাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত আসে ২০১১ সালের জুনে। সে বছর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দেয় ১৪৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পে।
রূপসা সেতু বাইপাস সড়কের পাশে ৩০ একর জমিতে পরিকল্পনা করা হয় আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন এই কারাগার। সরকারি নথি অনুযায়ী, শুরুতে বন্দির ধারণক্ষমতা ধরা হয়েছিল ৪ হাজার, পরে সংশোধন করে ২ হাজারে নামিয়ে আনা হয়—কারণ হিসেবে দেখানো হয় “প্রয়োজনীয় বাজেট সীমাবদ্ধতা”। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, ধারণক্ষমতা হ্রাসের পেছনে ছিল অন্য বাস্তবতা।
সূত্র জানায়, বন্দির ধারণক্ষমতা কমানোয় প্রকল্পের ভবন কাঠামো পরিবর্তন হয়, যার মাধ্যমে কিছু নির্মাণকাজ বাতিল হয় এবং নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। এই সংশোধনই “বাণিজ্যিক প্রভাব, ফেলেছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা।
বিলম্বের কারণ ও অস্বচ্ছতা :
তথ্য বলছে, প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১২ সালে, শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালের জুনে। কিন্তু এরপর একে একে পাঁচবার সময় বাড়ানো হয়। কোভিড-১৯ মহামারির অজুহাতে আরও দুই বছর বাড়ানো হয়। এখন পর্যন্ত কাজের ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, বাস্তবে নির্মাণকাজ চলছে পুরোদমে।
কারাগার প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, মূল ভবনের পাশে বেশ কিছু আনুষঙ্গিক ভবনে কাজ চলছে। ভবনের দেয়াল ও গেটের পেইন্টিং অসম্পূর্ণ, কিছু জায়গায় ফ্লোর টাইলস বসানোর কাজও বাকি।
একজন কর্মরত প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“উপরের চাপে একাধিকবার কাজের গতি থেমে গেছে। ঠিকাদারি পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় সময় গেছে অনেক। অনেক সময় বিলম্ব হয়েছে বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ে। প্রশ্ন উঠছে—যখন সরকারি কাগজে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে, তখন কেন এখনো শ্রমিকরা মাঠে কাজ করছে?
বাজেট দ্বিগুণ, ফলাফল অর্ধেক?
প্রাথমিক বাজেট ছিল ১৪৪ কোটি টাকা। কিন্তু দুই দফা সংশোধনের পর সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৮৮ কোটি টাকায়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরণের দ্বিগুণ ব্যয় বৃদ্ধির প্রকল্পে সর্বাধিক ঝুঁকি থাকে অনিয়ম ও অতিমূল্যায়নের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন—
যখন প্রকল্পের সময় বাড়ে, বাজেটও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে। এতে কাজের স্বচ্ছতা হ্রাস পায়, তদারকি দুর্বল হয়। খুলনা কারাগার প্রকল্পের ঘটনাটি তার স্পষ্ট উদাহরণ।
IMED (Implementation Monitoring & Evaluation Division)-এর একটি প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, “প্রকল্প শুরু আগে যথাযথ ‘feasibility study’ করা হয়নি।
তথ্য বলছে, ৪১টি টেন্ডারের মধ্যে ৯টি দীর্ঘদিন আহ্বান করা হয়নি, ফলে ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণ ঘটে।
ঠিকাদারদের ভূমিকা ও কমিশনের অভিযোগ:
সূত্র জানায়, প্রকল্পে কাজ করেছে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাদের কাজের তদারকিতে গাফিলতি ছিল স্পষ্ট।
একজন উপ-ঠিকাদার জানান,
আমরা উপকরণ সরবরাহ করেছিলাম নির্ধারিত সময়েই, কিন্তু বিল পরিশোধের অনুমোদন পেতে মাসের পর মাস লেগে গেছে। এর মধ্যেই নতুন দরপত্র আহ্বান হয়, পুরনোটি বাতিল।
অভিযোগ আছে, “কাজ বন্ধ রাখো—সময় বাড়বে, অর্থ বাড়বে”—এই প্রক্রিয়ায় ঠিকাদার ও কিছু কর্মকর্তার মধ্যে কমিশন ভাগাভাগি হয়েছে।
একজন সরকারি পর্যবেক্ষক বলেন:
যতদিন প্রকল্প চলবে, ততদিন অর্থ প্রবাহ থাকবে—এমনটাই অনেকে চায়। দ্রুত কাজ শেষ হয়ে গেলে ‘কমিশনের বাজার’ বন্ধ হয়ে যায়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প-সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।
প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া:
খুলনা জেলা কারাগারের জেলার মুনির হোসেন বলেন,
পুরোনো কারাগারের অতিরিক্ত চাপ কমানোর জন্য নতুন কারাগার অত্যন্ত জরুরি। আমরা আশা করেছিলাম জুলাই মাসের মধ্যে হস্তান্তর পাব, কিন্তু কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
PWD-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম জানান,
প্রাথমিকভাবে মে মাসে হস্তান্তর নির্ধারণ করা হয়েছিল, কিন্তু ঠিকাদারের কিছু জটিলতায় সময় বাড়াতে হয়েছে। অক্টোবরের মধ্যে হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে।”
প্রশ্ন উঠছে—যদি ৯৫% কাজ শেষ হয়, তবে কেন মাসের পর মাস হস্তান্তর বিলম্বিত হচ্ছে?
পুরনো কারাগারের অবস্থা: সংকট ও প্রয়োজন
ভৈরব নদীর তীরে ১৯১২ সালে নির্মিত পুরোনো খুলনা কারাগারটির ধারণক্ষমতা ৬৭৮ বন্দি। বর্তমানে সেখানে বন্দি আছেন প্রায় ১,৪০০ জন—দ্বিগুণেরও বেশি।
কারাগার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন কারাগার চালু হলে পুরনো কারাগারের উপর চাপ কমবে, কিন্তু বিলম্বে বন্দিদের মানবিক পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিচ্ছে।
একজন বন্দির স্বজন বলেন,
“আমার ভাই দুই বছর ধরে পুরোনো কারাগারে। জায়গা নেই, ঘুমানোর জায়গা পায় না। শুনেছি নতুন কারাগার তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেটি কবে খুলবে কেউ জানে না।”
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থার পরিচালক বলেন
এমন বিলম্ব মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। কারণ নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশে আটক রাখার দায়িত্ব সরকারের।
প্রকল্পের ভেতরের চিত্র :
নতুন কারাগারে রয়েছে নারী ও পুরুষ বন্দিদের জন্য পৃথক ভবন, ৫০ শয্যার হাসপাতাল, মোটিভেশন সেন্টার, ডে কেয়ার, হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ শেড, স্কুল, এবং লাইব্রেরি।
বাহ্যিকভাবে দেখতে এক আধুনিক আবাসিক এলাকার মতো—টাইলস বসানো হাঁটার পথ, সাজানো বাগান, ও নতুন রঙের ভবন।
তবে সূত্র জানায়, “দেখতে সুন্দর হলেও ভেতরে কাজ অসম্পূর্ণ, কিছু ব্লকে বিদ্যুৎ সংযোগ অনুপস্থিত, ড্রেনেজ ঠিকমতো হয়নি। একজন কারা প্রকৌশলী বলেন, “যদি পুরো প্রকল্প চালু হয়ও, পরবর্তী এক বছর মেরামত ও ইনস্টলেশনেই সময় লাগবে।
দুর্নীতির সম্ভাবনা: ‘উন্নয়ন’ না ‘বাণিজ্য’?
অভিযোগ উঠেছে, উন্নয়নের আড়ালে ক্ষমতার বাণিজ্যই হয়ে উঠেছে এই প্রকল্পের মুখ্য বিষয়।
দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চলায় প্রতিটি সংশোধনেই কমিশনের নতুন হিসাব তৈরি হয়েছে বলে জানায় প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।
এক সুশাসন সংগঠনের চেয়ারম্যান বলেন,
বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পে সময় বাড়ানো এখন অনেক সময় ‘ব্যবসায়িক কৌশল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুলনা কারাগার প্রকল্পও সেই ধারা থেকে ব্যতিক্রম নয়।”
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ :
প্রকল্প প্রশাসন-বিষয়ক বিশ্লেষক মীর রফিকুল ইসলাম বলেন,
প্রকল্প তদারকি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। কিন্তু এখানে IMED-এর ভূমিকা দুর্বল ছিল। সময় ও বাজেট বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জবাবদিহি হারিয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন,
“এই ধরনের কারাগার নির্মাণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো স্বচ্ছ টেন্ডার, প্রি-কোয়ালিফাইড ঠিকাদার, ও নিয়মিত অডিট। এসব প্রক্রিয়া যদি সময়মতো না হয়, দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।”
অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন,
“বাজেট দ্বিগুণ হলে, দায়ও দ্বিগুণ হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের প্রশাসনে দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি নেই।
তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতি:
তথ্য বলছে, প্রকল্পের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ২০১৯, ২০২১, ও ২০২৩ সালে একাধিক অনিয়ম ধরা পড়ে—যেমন সময়সীমা অতিক্রম, উপকরণ সরবরাহে বিলম্ব, ও বিল অনুমোদনে গড়িমসি।
তবে এসব প্রতিবেদনের কোনো সরকারি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
একজন অবসরপ্রাপ্ত কারা কর্মকর্তা বলেন,
এখনকার বাস্তবতায় প্রকল্প সম্পন্ন করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধা বজায় থাকে, তাহলে কাজ চলতে থাকে, শেষ হয় না।”
স্থানীয় জনমত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া :
স্থানীয় নাগরিক সমাজ মনে করে, এই প্রকল্পের বিলম্ব শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকও।
রূপসা এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন,
কারাগারের কাজ শুরু হওয়ার পর রাস্তা ও নালা ঠিক করার প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু হয়নি। বরং প্রকল্পের জন্য যে জায়গা নেওয়া হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ এখনো অনেকে পাননি।”
খুলনা নাগরিক ফোরামের সমন্বয়ক বলেন :
এই প্রকল্প সরকারের ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িত। তাই দায় এড়ানোর প্রবণতা চোখে পড়ে। সবাই চুপ, কিন্তু টাকা যাচ্ছে, সময় যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান ও তুলনামূলক চিত্র :
বিষয় প্রাথমিক অবস্থা সংশোধিত অবস্থা, অনুমোদনের বছর ২০১১ -
বাজেট ১৪৪ কোটি টাকা ২৮৮ কোটি টাকা,মেয়াদ ২০১৬ ২০২৫ (পঞ্চমবার বৃদ্ধি)
জমির আয়তন ৩০ একর অপরিবর্তিত,ধারণক্ষমতা ৪,০০০ বন্দি ২,০০০ বন্দি
ভবনের সংখ্যা ৫২ ৫২,বাস্তবায়ন অগ্রগতি ১০০% (কাগজে) ~৯০–৯৫% (বাস্তবে)
উপসংহার: উন্নয়নের প্রতীক নাকি দুর্নীতির নিদর্শন?
তথ্য বলছে, খুলনার নতুন জেলা কারাগার প্রকল্প উন্নয়নের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আজ তা দুর্নীতির ও অস্বচ্ছতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
১৩ বছর পরও কাজ শেষ হয়নি, বাজেট দ্বিগুণ হয়েছে, কিন্তু বন্দিরা এখনো পুরনো, অস্বাস্থ্যকর ও অতিরিক্ত জনাকীর্ণ ভবনে বন্দি।
প্রশ্ন উঠছে—এই প্রকল্পের বিলম্বে লাভবান কারা? দায়ী কারা? সরকারি অর্থের এই বিশাল ব্যয়ের জবাব কে দেবে?
একজন প্রবীণ সাংবাদিকের ভাষায়,
“যদি উন্নয়নই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে প্রকল্প শেষ হতো পাঁচ বছরেই। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—এটি উন্নয়ন নয়, বরং উন্নয়নের ছদ্মবেশে প্রশাসনিক ব্যবসা।”
সরকারের উচিত দ্রুত তদন্ত করে প্রকল্পের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং জনগণের অর্থ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
খুলনার নতুন জেলা কারাগার—একটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির প্রতীক।
উন্নয়নের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার বাণিজ্য, বিলম্ব, এবং জনগণের অর্থের অস্বচ্ছ ব্যবহার—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত প্রশ্নচিহ্ন:
“এটি কি কারাধাম, নাকি কার-বাণিজ্যের মঞ্চ?