অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 31, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ডিপ ফ্রিজে ফাইল, এই বরফ কবে গলবে


নিজস্ব প্রতিবেদন | 

দুই উপদেষ্টার সাবেক এপিএস ও পিও-র দুর্নীতি অনুসন্ধান কোথায় থেমে গেল?
কান টানলে মাথা আসবে—দুদকের এক কর্মকর্তার মুখ থেকে উচ্চারিত এই বাক্যটি এখন নতুন করে আলোচনায়। কারণ, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টাদের দুই সাবেক সহযোগীর দুর্নীতির ফাইল যেন ঢুকে গেছে ‘ডিপ ফ্রিজে’।
তথ্য বলছে, দুদকের গোয়েন্দা ইউনিট তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পেলেও সাত মাস পেরিয়ে গেছে, এখনও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অভিযোগ উঠছে, ক্ষমতার ছায়াতলে থাকা দুই প্রভাবশালী সহযোগীর বিষয়ে তদন্তে গতি নেই বললেই চলে।

সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক এপিএস মো. মোয়াজ্জেম হোসেন এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের পিও তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে বদলি-পদোন্নতির মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্য, কেনাকাটায় কমিশন আদায়, এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৪ মে দুদক পৃথক দুটি অনুসন্ধান টিম গঠন করে। তদন্তকালে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে “অস্বাভাবিক লেনদেন” শনাক্ত করে দুদককে প্রতিবেদন দেয়।

কিন্তু এরপর? — “সব চুপ।

দুদক শুধু একবার তলব করেই থেমে গেছে। এরপর থেকে অনুসন্ধান কার্যত ‘নিঃশব্দ মোডে’ চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুদকের অনুসন্ধান টিমের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা তথ্য পেয়েছি, কিন্তু যত গভীরে যাচ্ছি, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এই ফাইলের চারপাশে অদৃশ্য সীমারেখা টানা আছে। কোথায় যেন থামতে হয়, সবাই বুঝে গেছে।

তথ্য বলছে, বিএফআইইউ-এর পাঠানো ব্যাংক হিসাব বিবরণীতে অভিযুক্তদের অ্যাকাউন্টে কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে। তবুও কেন মামলা হয়নি—এই প্রশ্ন এখন সংস্থার ভেতরেও ঘুরপাক খাচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে: দুদকের গতি কি ‘ক্ষমতার দিকনির্দেশে’?
একাধিক বিশ্লেষক বলছেন, দুদক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সরকারবিরোধী বা ক্ষমতার বাইরে থাকা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বেশি সক্রিয়। কিন্তু ক্ষমতার ছায়ায় থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তাদের গতি কমে যায়।

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল)  মন্তব্য করেন—
যে সরকার যেমনভাবে চালাতে চায়, তেমনভাবেই দুদক চলে। সরকারের মর্জি-মেজাজ বুঝেই কাজ হয়, এটা বরাবরের ট্র্যাডিশন। এই মন্তব্যের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন উঠছে—
দুদক কি স্বাধীন সংস্থা, নাকি নিয়ন্ত্রিত কমিশন?

দুদকের ব্যাখ্যা,তদন্ত চলমান, অকাট্ট প্রমাণ পাইনি
এই প্রশ্নের জবাবে দুদক  বলেন, দুই উপদেষ্টার সাবেক এপিএস ও পিও-এর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান। এখনো অকাট্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রমাণ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যখন প্রাথমিক সত্যতা নিশ্চিত, ব্যাংক লেনদেন প্রমাণিত, তখন প্রমাণের ঘাটতি কোথায়? তথ্য বলছে, উপদেষ্টাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে এ দুই কর্মকর্তা প্রকল্প ও বদলির বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণ করতেন। এমনকি কিছু সরকারি পদে নিয়োগও তাদের প্রস্তাবিত নাম অনুযায়ী হতো।

একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন,
তারা নিজেদের ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ হিসেবে উপস্থাপন করতেন। কোনো বদলির দরকার হলে, বা কোনো ঠিকাদারি দরপত্রে সুযোগ পেতে হলে তাদের অফিসে যোগাযোগ করাই ছিল একমাত্র রাস্তা।
সূত্র জানায়, এই অর্থ আদানপ্রদানের বড় অংশ ব্যাংকের বাইরে ‘ক্যাশ লেনদেন’ হিসেবে সম্পন্ন হতো—যার কিছু প্রমাণ মোবাইল ব্যাংকিং রেকর্ডেও রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিমত: “বদলি মানে টাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলা কর্মকর্তা বলেন,
প্রতি বদলির জন্য চাওয়া হতো কয়েক লাখ টাকা। বলা হতো—‘উপদেষ্টার নির্দেশ’। টাকা না দিলে ফাইল আটকে যেত।

একজন ঠিকাদার জানান,
একবার দরপত্রে অংশ নিয়ে দেখি, আগে থেকেই বলা আছে—‘এটার কাজ ওই ঠিকাদার পাবে’। পরে জানতে পারি, কমিশন আগেই দেওয়া হয়েছে।

তথ্য বলছে, এই রকম ‘অফিসিয়াল ঘুষ-নেটওয়ার্ক’ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে আছে, যেখানে রাজনৈতিক ছায়ার তলে একদল এপিএস-পিও-চক্র রাজত্ব করছে।

টিআইবি বলছে: অনুসন্ধান থেমে গেলে আস্থাও হারায়
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক  বলেন,
যেহেতু অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে, তবুও যদি অনুসন্ধানে অগ্রগতি না হয়, তাহলে দুদক আগের চর্চার ধারক হয়ে যাচ্ছে—এমন প্রশ্ন উঠবেই। এটা শুধু দুদকের জন্য নয়, দেশবাসীর জন্যও হতাশাজনক।

তিনি সতর্ক করে বলেন,
এখনই যদি এই দুর্বলতা দেখা দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রবণতা আরও ভয়ানক হবে।

পরিসংখ্যান বলছে: দুর্নীতি বাড়ছে, মামলা কমছে,দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়—
২০২২–২৩ অর্থবছরে অনুসন্ধানকৃত ফাইলের সংখ্যা ১৭ % কমেছে।
কিন্তু একই সময়ে দুর্নীতি-সংক্রান্ত অভিযোগ বেড়েছে ৪৫ %।
সরকারি নিয়োগ ও প্রকল্পে ঘুষ-সংক্রান্ত অভিযোগই সবচেয়ে বেশি।
এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, দুদকের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এখন বিপরীত অনুপাতে কাজ করছে—অভিযোগ বাড়ছে, পদক্ষেপ কমছে।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া দুদকের সামনে নীরব মিছিল

গত জুলাইয়ে যুব অধিকার পরিষদ “মার্চ টু দুদক” কর্মসূচি নিয়ে সেগুনবাগিচা ঘেরাও করে দুর্নীতির বিচার দাবি করে। পরে তারা দুদকে স্মারকলিপি দেয়।

কিন্তু এখন তাদের হতাশার সুর, তদন্ত শুরু হয়েছিল, তারপর শুধু নীরবতা। যেন সবকিছু গিলে ফেলেছে কোনো অজানা শক্তি।

প্রসঙ্গত, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরেই সরকার দুইজনকেই অব্যাহতি দেয়।২২ এপ্রিল: উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনকে অব্যাহতি। তার আগে,  স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের পিও তুহিন ফারাবীকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু অনুসন্ধান?—সেখানেই প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “ডিপ ফ্রিজ” সংস্কৃতি নতুন নয়—প্রভাবশালী ব্যক্তি বা তাদের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান প্রায়ই অদৃশ্য নির্দেশে থেমে যায়।

একজন অবসরপ্রাপ্ত দুদক কর্মকর্তা বলেন,
ফাইল বন্ধ করা হয় না, বরং ফ্রিজে রাখা হয়। যেন প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়, আর প্রয়োজন শেষ হলে গলে যায়। এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


দুর্নীতি দমন কমিশন একসময় জনগণের আশার জায়গা ছিল। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে—
দুদক কি এখনও স্বাধীন? নাকি ‘নির্বাচিত নীরবতা’র আরেক নাম?
যদি প্রমাণ হাতে থাকা সত্ত্বেও তদন্ত স্থবির থাকে, তবে তা শুধু একটি মামলার ব্যর্থতা নয়—পুরো প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসের অবক্ষয়।

 ডিপ ফ্রিজে ফাইল শুধু একটি রূপক নয়, বরং বাংলাদেশের দুর্নীতি-বিরোধী লড়াইয়ের শীতল বাস্তবতা।
এখন প্রশ্ন—এই বরফ কবে গলবে?


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বদলে যাওয়া ক্যাম্পাস

1

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিতে পুলিশের বড় উদ্যোগ

2

খুলনা ১২ নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের কমিটি গঠন

3

পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা আগমন

4

যৌতুকের দাবিতে নির্মম নির্যাতন, বিজিবি সদস্য মোঃ জসিম উদ্দিন

5

পাবনার সাঁথিয়ায় পুত্রবধূর কোপে শ্বশুর নিহত

6

খুলনায় ডিপোর ভেতর ট্যাংকলরি থেকে অকটেন চুরি, পাঁচজন আটক ও জর

7

সাংবাদিকতা পেশায় রাজনৈতিক দলবাজি বন্ধ করা দরকার: সংস্কার কমি

8

ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার নারী সদস্যর

9

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ৩১ দফা লিফলেট বিতরণ

10

১২ ফুট লম্বা কিং কোবরা উদ্ধার।

11

সুন্দরবনে দস্যুদের কবল থেকে জেলে উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড

12

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সবাই আন্তরিকতার হবে : প্রাথমিক ও

13

সওজে শত কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ বিভাগীয় হিসাব রক্ষক জাকির

14

বিআইডব্লিউটিএ কালো টাকার সাম্রাজ্যে প্রকৌশলী আইয়ুব আলী

15

ইন্দোনেশিয়ার স্কুলের মসজিদে বিস্ফোরণে আহত অর্ধশতাধিক

16

মৃত ব্যক্তির ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

17

ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী নিহত

18

গণপূর্তের ই–এম বিভাগ–৩/ ১০ লাখ টাকার ভিডিওতে উন্মোচিত দুর্নী

19

জলকামান-সাউন্ড গ্রেনেডে শিক্ষকদের ছত্রভঙ্গ

20