নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজার সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম–দুর্নীতির একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রধান সহকারী সমরেশ দে–কে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অভিযোগের তদন্ত চলমান থাকায় সমরেশ দে বর্তমানে ওএসডি হিসেবে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে সংযুক্ত আছেন।
সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদানের পর থেকেই সমরেশ দে–র বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ ও চাকরির বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে—এমনটি জানিয়েছেন একাধিক সেবাপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র। অভিযোগ রয়েছে, জমির মৌজা ও দলিলের ধরন দেখে তিনি ঘুষের নির্দিষ্ট অঙ্ক প্রস্তাব করতেন এবং দাবির সঙ্গে অসঙ্গতি দেখা দিলে দলিল নিবন্ধন বিলম্বিত হওয়ার নজির আছে বলে একাধিক সেবাপ্রার্থী দাবি করেছেন।
সূত্র বলছে, এসব গোপন লেনদেন অফিসের কয়েকজন কর্মচারীর নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই সম্পন্ন হতো। এর মধ্যে আছেন নৈশ প্রহরী নবাব মিয়া ও অফিস সহায়ক মানিক পাল, যাদের বিরুদ্ধে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদকের কাছে ঘুষ লেনদেনের ভিডিও থাকার কথাও একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
সংবাদকর্মী পরিচয়ে তাদের কাছে মন্তব্য জানতে চাইলে দুজনই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তারা দাবি করেন, “সংবাদ প্রকাশ হলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে না” এবং টাকার অংশ “অফিসের একাধিক জনের মধ্যে বণ্টিত হয়”—এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসে দলিল যাচাই–বাছাই, নকল উত্তোলন, নিবন্ধন অনুমোদনসহ অন্তত ১৭টি সেবার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি ফি নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও এসব অতিরিক্ত অর্থ কোথায় ও কীভাবে আদায় হচ্ছে।
সেবা প্রার্থীদের দাবি, নির্ধারিত চার্জ ছাড়া দলিল নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করা হয়। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন যে, দলিল লেখক, নকলনবিশ, মোহরার ও দালালের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, যা অফিসের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।
তথ্য বলছে, কয়েক মাস আগে নিয়মভঙ্গ ও কাজে গাফিলতির অভিযোগে অন্তত ১৫ জন নকলনবিশকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তারা পরবর্তীতে পুনরায় কাজে ফিরে এসেছেন। সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠছে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং তা টেকসই কিনা।
সাধারণ নিয়মে দলিলের নকল সরবরাহে এক থেকে দুই মাস সময় লাগলেও, অতিরিক্ত অর্থ দিলে ২-৩ দিনের মধ্যেই নকল সরবরাহ করা হয়—এমন অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। সূত্র জানায়, মহাফেজখানা পরিদর্শনে নিয়মিত তদারকি না হওয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের মধ্যে গাফিলতি ও স্বেচ্ছাচার বাড়ছে। এছাড়া, অভিযোগ রয়েছে—জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অসংগতিসহ নানা কারণে দলিল নিবন্ধন আটকে দেওয়া হয়, আর এসব সমাধানের ক্ষেত্রেও অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের দাবি করা হয়।
সদর সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে ফোনে মন্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে অফিসের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি। সচেতন মহলের দাবি, প্রকাশিত রিপোর্ট ও উত্থাপিত অভিযোগগুলো গভীরভাবে তদন্ত করা জরুরি। তাদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ঘুষ–দুর্নীতি বিষয়ে এমন অভিযোগ উঠলে শুধু ব্যক্তিগত শাস্তি নয়, সামগ্রিক কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
এদিকে, জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় বলছে—উত্থাপিত অভিযোগগুলো প্রক্রিয়াধীন তদন্তের মধ্য দিয়ে যাচাই করা হবে এবং প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
-