কলম্বিয়ায় গেরিলা হামলায় নিহত ১৮, আহত ৬০’র বেশি: শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে ফের শঙ্কা
কলম্বিয়ায় বৃহস্পতিবারের দুটি পৃথক গেরিলা হামলায় কমপক্ষে ১৮ জন নিহত এবং অন্তত ৬০ জন আহত হওয়ার ঘটনা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রক্রিয়াকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ক্যালি ও উত্তরের একটি কোকা খামারে চালানো প্রাণঘাতী এই হামলাগুলো আসন্ন নির্বাচনপূর্ব সময়ে নতুন করে নিরাপত্তা প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে।
বিস্ফোরক বোঝাই ট্রাক ও ড্রোন হামলা
তথ্য বলছে, স্থানীয় সময় বিকাল ৩টার দিকে ক্যালির একটি সামরিক বিমান চলাচল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কাছে বিস্ফোরকবোঝাই একটি ট্রাক বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে ৬ জন নিহত হন এবং ৬০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। এছাড়া আরেকটি হামলায় একটি পুলিশ হেলিকপ্টারকে ড্রোন ব্যবহার করে ভূপাতিত করা হয়, যেখানে আরও ১২ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের পরপরই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, বাড়িঘর ধসে পড়ে, যানবাহনে আগুন ধরে যায় এবং আহতদের আর্তনাদে আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোতে এই দৃশ্যগুলোই উঠে এসেছে।
কেন এই হামলা, দায়ী কারা?
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই হামলার জন্য ‘সেন্ট্রাল জেনারেল স্টাফ’ (EMC) নামে পরিচিত একটি বিদ্রোহী গেরিলা গোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন। এই গোষ্ঠীটি ২০১৬ সালে শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয়ে অস্ত্র জমা দেওয়া FARC (Revolutionary Armed Forces of Colombia) থেকে ছিটকে পড়া একদল ভিন্নমতাবলম্বীর দ্বারা গঠিত হয়। তাদের নেতা হিসেবে পরিচিত ইভান মর্ডিস্কো একাধিক সহিংস ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, গোষ্ঠীটি মূলত কোকা উৎপাদন কেন্দ্র ও সীমান্ত অঞ্চলে আধিপত্য ধরে রাখতে নতুন করে হামলা শুরু করেছে।
‘শান্তির প্রতিশ্রুতি কি ব্যর্থ হতে চলেছে?’
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হামলা শুধু একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নয়—এটি শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন ও স্থায়ীত্বের প্রশ্নে বড় ধরনের বার্তা বহন করে। প্রশ্ন উঠছে, ২০১৬ সালের ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে যে সহিংসতার অবসান ঘটানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল, তা কতটা কার্যকর হয়েছে? EMC গোষ্ঠীর মতো দলগুলোর সক্রিয়তা এই চুক্তির বাস্তবতা ও ফলপ্রসূতা নিয়ে সন্দেহ জাগিয়ে তুলছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা
ক্যালির মেয়র আলেজান্দ্রো এডার হামলার পর শহরে সামরিক আইন জারি করেন এবং বড় ট্রাক চলাচলের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি আহ্বান জানান—ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সম্পর্কে তথ্য দিতে, যার জন্য ১০ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে কলম্বিয়ার প্রশাসনের দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রশংসনীয় হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কিভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ ঘাঁটির মতো উচ্চ নিরাপত্তা এলাকায় একটি বিস্ফোরকবোঝাই ট্রাক অনুপ্রবেশ করতে পারে? অথবা কীভাবে একটি পুলিশ হেলিকপ্টার ড্রোন হামলার শিকার হয়?
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্ব সম্প্রদায় এখনো এই হামলার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলগুলোর দৃষ্টি আরও নিবদ্ধ হবে কলম্বিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
উপসংহার: অস্থিরতার ছায়া
কয়েক দশক ধরে গৃহযুদ্ধের পর শান্তিপূর্ণ কলম্বিয়ার যে আকাঙ্ক্ষা গড়ে উঠেছিল, বৃহস্পতিবারের হামলা সেই স্বপ্নে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। দেশের ভেতর এবং বাইরের পর্যবেক্ষকরা এখন আশঙ্কা করছেন, যদি এই হামলাগুলোর জবাব যথাযথভাবে দেওয়া না হয় এবং চুক্তিভিত্তিক পুনঃসংলাপ না হয়, তাহলে সহিংসতা আবারও দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।