নিজস্ব প্রতিবেদক
কোর্টের স্টে অর্ডারে থমকে জনতা ব্যাংকের দুই হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি তদন্ত
সাবেক চেয়ারম্যান–এমডিসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ; তদন্ত ধীর করতে ‘আইনকে হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ
জনতা ব্যাংকের প্রায় ১,৯৬৩ কোটি ৫৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক চেয়ারম্যান–এমডিসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা দায়ের হলেও তদন্তের অগ্রগতি এখন কার্যত স্থগিত। আদালত থেকে নেওয়া স্টে অর্ডার–এর কারণে দুর্নীতি অনুসন্ধান ধীর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠছে সংশ্লিষ্টদের।
দুদক কর্মকর্তারা বলছেন—স্টে আদেশের ফলে নথি সংগ্রহ, সাক্ষীগ্রহণ, জিজ্ঞাসাবাদ—সবকিছুই বিলম্বিত হচ্ছে। ফলে তদন্ত “প্রায় থমকে” গেছে।
গত ৭ ডিসেম্বর দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হক এই মামলা দায়ের করেন। এজাহারে বলা হয়— পরস্পর যোগসাজশে,অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ,প্রতারণা,ঋণ অনুমোদনের শর্ত ভঙ্গ,সীমাতিরিক্ত ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড দায় সৃষ্টিট্রাস্ট রিসিপ্ট (TR) ও ইনডেমিনিটি রিসিপ্ট (LI) অপব্যবহার,
মাধ্যমে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখা থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়।
সরকারি নথি অনুযায়ী আসামিরা, জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. জামালউদ্দিন আহমেদ, ড. এস.এম. মাহফুজুর রহমান, সাবেক এমডি মো. আব্দুস সালাম আজাদ, উচ্চপদস্থ ১৭ কর্মকর্তা এবং এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আরও ১৭ জন ব্যবসায়ী।
দুদকের দাবি—বহুস্তরীয় যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের অনিয়ম সম্ভব নয়।
স্টে অর্ডার: তদন্ত ধীর করার ‘কৌশল’? মামলার কয়েকজন প্রভাবশালী আসামি তদন্তের বিভিন্ন ধাপ স্থগিত রাখতে আদালতে আবেদন করেন। আদালত তাঁদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কয়েকটি বিষয়ে স্টে অর্ডার দেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য—স্টে অর্ডার বৈধ অধিকার। কিন্তু চেইনড অর্থাৎ পর্যায়ক্রমে স্টে নিতে পারলে যে কোনো বড় দুর্নীতি মামলাই বছরের পর বছর ঝুলে যেতে পারে। প্রশ্ন উঠতেই পারে—এটি কি সত্যিই ন্যায়বিচারের প্রয়োজনে, নাকি তদন্ত ঠেকানোর কৌশল?
স্টে অর্ডারে কারা কী সুবিধা পাচ্ছে (বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ) দুদকের জিজ্ঞাসাবাদ স্থগিত,ব্যাংকিং নথি দাখিলে বিলম্ব,সাক্ষীরা জবানবন্দি দিতে নিরুৎসাহ,তদন্তে তথ্য–প্রমাণ সংগ্রহ ধীরগতির,আসামিদের জন্য সময় কেনার সুযোগ,মামলার অগ্রগতি জনসমক্ষে কম দৃশ্যমান,আর্থিক অনিয়মে বিচার বিলম্বের সম্ভাবনা বৃদ্ধি,
দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন—প্রতিবারই যখন আমরা কোনও গুরুত্বপূর্ণ নথি চাই বা কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের নোটিশ দিই, আদালত থেকে স্টে আসে। এতে তদন্ত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তথ্য বলছে: নিয়ম ভেঙে বারবার দেওয়া হয়েছে ঋণ।দুদকের নথি ও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট রিপোর্টে দেখা যায়—কোম্পানির প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি লিমিট অনুমোদন, কাগুজে মালামাল দেখিয়ে বিপুল ঋণ আদায়।গ্লোবাল ট্রেডিং কর্পোরেশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে কৃত্রিম লেনদেন।
একই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে ঋণ বিতরণের চক্র।
ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়াই ফান্ডিং এ বিষয়ে এক ব্যাংকিং বিশ্লেষক বলেন—এ ধরনের ঘটনা সাধারণ ভুলের কারণে হয় না। এটি সংগঠিত পরিকল্পনার অংশ না হলে এত বড় দুর্নীতি সম্ভব নয়।
জনতা ব্যাংকের এক আমানতদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—জনগণের ব্যাংকের টাকা লুট হয়ে গেল, কিন্তু তদন্তই এগোচ্ছে না। মানুষ তাহলে কোথায় আস্থা রাখবে? এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন—
ব্যাংকে রাখলে টাকা নিরাপদ—এই বিশ্বাসই ভেঙে যাচ্ছে। স্টে অর্ডার যদি দুর্নীতি ঢাকতেই ব্যবহৃত হয়, তবে এটি ভয়ংকর।
পরিসংখ্যান কী বলছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী— রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ লাখ কোটি টাকার বেশি।বড় দুর্নীতি মামলার ৮০%–এর বেশি দীর্ঘসূত্রতার কারণে নিষ্পত্তি পায় না।যেসব মামলায় স্টে থাকে, সেগুলো গড়ে ৭–১২ বছর ঝুলে থাকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে—স্টে অর্ডার অপব্যবহার হলে আর্থিক খাতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়। এতে ভবিষ্যতে আর্থিক অপরাধ আরও বাড়বে। প্রশ্ন উঠছে — কে দায় নেবে এই ধীরগতির জন্য? দুদক বলছে—আইনের সীমার মধ্যে থাকতেই হচ্ছে। স্টে থাকলে তদন্তের কিছু ধাপ আগানো যায় না।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন—বড় দুর্নীতি মামলায় ধারাবাহিক স্টে নেওয়া কি তদন্তকে অকার্যকর করে দিচ্ছে?জনগণের টাকা লুট হলে তদন্ত এভাবে স্থগিত থাকা কি গ্রহণযোগ্য?নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কি যথেষ্ট স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে?
জনতা ব্যাংকের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা, ব্যাংকিং নীতি ও দুর্নীতি দমনে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। আদালতের স্টে অর্ডার তদন্তকে কতটা প্রভাবিত করছে, তা নিয়েও বিতর্ক দানা বাঁধছে।
তদন্ত এগোবে কি না—তা এখন নির্ভর করছে আইনি জটিলতা কবে কাটবে তার ওপর।
এক অর্থনীতিবিদের মন্তব্যে বিষয়টি পরিষ্কার—স্টে অর্ডার যদি বিচারপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করে—সেটা ভালো। কিন্তু যদি দুর্নীতি তদন্তকে ধীর করতে ব্যবহৃত হয়—তাহলে এটিই একটি বড় দুর্নীতি।”