নিজস্ব প্রতিনিধি |
আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিদেশে ওবায়দুল করিম
দুর্নীতি, অর্থপাচার ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম সম্প্রতি বিদেশে গেছেন—যদিও তার বিদেশযাত্রায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল বহাল।
দুদকের (দুর্নীতি দমন কমিশন) আবেদন ও আদালতের নির্দেশে তার এবং তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়, পাশাপাশি বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছিল।
তবে প্রশ্ন উঠছে, কিভাবে এমন একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি—যার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, অর্থপাচারের প্রমাণ এবং আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে—তিনি প্রকাশ্যেই বিমানবন্দর হয়ে দেশ ছাড়লেন?
সূত্র বলছে, আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।
সরকারি সংস্থা, আদালত ও ইমিগ্রেশন—তিন পক্ষের ‘নীরব ভূমিকা’ এখন জনমনে আরও প্রশ্ন তুলেছে।
দুদকের উপপরিচালক মো. রাশেদুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত একটি টাস্কফোর্স ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ওবায়দুল করিম ও তার পরিবারের বিদেশযাত্রা বন্ধের অনুরোধ করে চিঠি দেয় ইমিগ্রেশন বিভাগে।
এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই, ৩০ জুলাই, ২০২৫ রাতেই, তিনি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অনুমতি দেখিয়ে বিদেশ পাড়ি জমান—যা আইন অনুযায়ী অবৈধ।
দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
বিদেশযাত্রা নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের, কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের নয়। কিন্তু মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে ওবায়দুল করিম দেশ ছাড়েন, যা স্পষ্টতই বেআইনি।
ওবায়দুল করিমকে বিমানবন্দরে আটক না করার বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা উঠেছে।
দুদকের অফিসিয়াল চিঠি অনুযায়ী, তার নাম বিদেশে না যাওয়ার তালিকায় ছিল।
তবুও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে ছেড়ে দেন।
দুদকের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার আগে দুদকের ক্লিয়ারেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু ইমিগ্রেশন বিভাগ সেটি করেনি।
অভিযোগ উঠেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাপে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে যেতে দেন।
একজন সাবেক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, এ ধরনের অনুমতি কোনোভাবেই বৈধ নয়। টাস্কফোর্স বা দুদকের অনুমতি ছাড়া কেউ যেতে পারে না। কিন্তু যদি রাজনৈতিক প্রভাব থাকে, নিয়ম তখন অনেক সময় প্রয়োগ হয় না।
ওবায়দুল করিম বাংলাদেশের অন্যতম বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী ওরিয়ন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা।
ব্যবসা জীবনের শুরুতেই তিনি ব্যাংক ঋণ, প্রকল্প ও সরকারি চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন।
তথ্য বলছে, ২০০০-এর দশকের শুরুতে তিনি ওরিয়েন্টাল ব্যাংক থেকে প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। ওয়ান ইলেভেন (২০০৭-২০০৮) সরকারের সময় তিনি এই অপরাধের দায় স্বীকারও করেন।
তবু, বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় ঝুলে পড়ে।
গত ১৬ বছরে তিনটি মামলায় তার মোট ৪৮ বছরের কারাদণ্ডের রায় হয়েছে, কিন্তু এখনো তিনি মুক্তভাবে চলাফেরা করছেন। আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম বলেন,
যদি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও প্রশাসনিক প্রভাবে আইনকে পাশ কাটাতে পারেন, তাহলে ন্যায়বিচার ধারণাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যন্ত, ওবায়দুল করিম সরকারি প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনি ‘ম্যানেজমেন্ট পলিটিকস’–এর এক নিখুঁত উদাহরণ। অর্থাৎ, প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক মহলে বিনিয়োগ করে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল।
একজন সাবেক সচিব বলেন,
ওবায়দুল করিম সব সময়ই কোনো না কোনো প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ছিলেন। কেউ তাকে হাত দিতে পারেনি, কারণ তার পেছনে ছিল অর্থ আর প্রভাব।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর একটি বিশেষ আর্থিক অপরাধ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
এই টাস্কফোর্সে রয়েছে দুদক, বিএফআইইউ, সিআইডি ও বাংলাদেশ ব্যাংক–এর কর্মকর্তারা।
টাস্কফোর্সের এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ ১০টি শিল্পগোষ্ঠীকে অর্থপাচার ও দুর্নীতির প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে— এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, এবং ওরিয়ন গ্রুপ (ওবায়দুল করিম)।
তদন্তে ওরিয়ন গ্রুপের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫,০০০ কোটি টাকার আত্মসাত ও পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দুবাই, সিঙ্গাপুর, এবং মালয়েশিয়ায় তার বিনিয়োগ ও সম্পত্তির সন্ধানও মিলেছে বলে টাস্কফোর্সের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের চিঠি অনুযায়ী, তার বিদেশযাত্রা ১৭ ফেব্রুয়ারির আদালতের আদেশে নিষিদ্ধ হয়।
এরপরও ৩০ জুলাই রাতে তিনি বিদেশে যান। যাচাই করে দেখেছে, ৩১ জুলাই মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে তিনি এক মাসের জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পান—যা সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত ছিল না। এটি স্পষ্টতই আইন বহির্ভূত অনুমতি।
প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে আদালতের অভ্যন্তরেই এমন ‘অবৈধ অনুমতি’ প্রদান সম্ভব হলো?
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো প্রভাবশালী মহলের সরাসরি ‘ইনফ্লুয়েন্স’ ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিবিসিকে বলেন, এটি প্রশাসনিক কারসাজি ছাড়া হতে পারে না। আদালত, দুদক, ইমিগ্রেশন—সবাই জানত এই নিষেধাজ্ঞার কথা।
রাষ্ট্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি ওবায়দুল করিমের পরিবারের সকল ব্যাংক হিসাব জব্দ করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ব্যাংক লেনদেনও স্থগিত করা হয়।
কিন্তু, আরেকটি সরকারি সংস্থা—স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—এ সময় তাকে “ওমরাহ পালনের অনুমতি” দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ওবায়দুল করিম প্রথমে আদালত থেকে চিকিৎসা ও ধর্মীয় কাজের অজুহাতে অনুমতি নেন। তথ্য বলছে, এরপর হাইকোর্ট সেই অনুমতি স্থগিত করে।
কিন্তু তিনি কৌশল পাল্টে অন্য আদালত থেকে অনুমতি নিয়ে বিদেশে যান—যা আইন অনুযায়ী অবৈধ।
ওরিয়ন গ্রুপের প্রকল্প, ঋণ ও চুক্তি সংক্রান্ত জালিয়াতিতে বহু বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
একটি সরকারি ব্যাংকের সাবেক পরিচালক বলেন, ওরিয়ন অনেক প্রকল্পে ঋণ নিয়েছে কিন্তু ফেরত দেয়নি। প্রকল্প বন্ধ থাকলেও ব্যাংকগুলো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. মাহফুজ রহমান বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বড় অংশ এখন রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। ওরিয়ন গ্রুপ তার একটি প্রতীক। বড় বড় নামগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে রাষ্ট্রীয় আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়বে।
ওবায়দুল করিম বিদেশ যাওয়ার পর ১১ দিন পার হয়ে যায় দুদকের কোনো পদক্ষেপ ছাড়াই।
পরবর্তীতে ১০ আগস্ট ২০২৫, দুদক হাইকোর্টে গিয়ে তার বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার আবেদন করে।কিন্তু তখন তিনি ইতিমধ্যেই দেশের বাইরে।
একজন দুদক কর্মকর্তা বলেন,
আমরা অবগত ছিলাম, কিন্তু প্রশাসনিক অনুমতি পেয়ে গেছেন—তাই কিছু করা যায়নি।
তবে দুর্নীতি-বিরোধী সংগঠন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক মন্তব্য করেন, এমন ঘটনায় দুদক যদি নীরব থাকে, তাহলে জনগণের বিশ্বাস হারানো অনিবার্য। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি এক ধরনের যোগসাজশ।”
ওবায়দুল করিম ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এক মাসের জন্য বিদেশ গিয়েছিলেন।
কিন্তু চার মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি আর দেশে ফেরেননি। দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে অবস্থান করছেন, এবং সেখান থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ওরিয়ন গ্রুপের কর্পোরেট অফিসে যোগাযোগের চেষ্টা করলে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনাটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও বিচারিক জবাবদিহির দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে। যখন আদালতের আদেশও প্রয়োগ হয় না, তখন আইনের শাসনের ধারণাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদ ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী মন্তব্য করেন,
বাংলাদেশে করপোরেট দুর্নীতি কেবল আর্থিক নয়, এটি এখন প্রশাসনিক সুরক্ষায় রূপ নিয়েছে। যতক্ষণ না জবাবদিহির কাঠামো শক্ত হয়, ততক্ষণ এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
ওবায়দুল করিমের বিদেশযাত্রা ইস্যু শুধু একজন ব্যবসায়ীর পালিয়ে যাওয়া নয়;
এটি বাংলাদেশের আইনের শাসন, প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের আন্তঃসম্পর্কের এক প্রতীকী চিত্র। টাস্কফোর্সের একজন সদস্য বিবিসিকে বলেন,
আমরা প্রমাণ পাচ্ছি, কিন্তু প্রয়োগের জায়গায় বাধা আসে। প্রশাসনিক ছায়া না কাটলে এই তদন্তের ফলাফলও অনেক আগের মতো ধামাচাপা পড়বে।
প্রশ্ন এখন একটাই —
রাষ্ট্র কি তার নিজের আইন প্রয়োগে সক্ষম, নাকি ক্ষমতাশালীদের প্রভাবে তা আগের মতোই নিস্তেজ থাকবে?