অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Nov 2, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বদলি বাণিজ্য: সংকটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বদলি বাণিজ্য: সংকটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড


 নিজস্ব প্রতিবেদন | ঢাকা

চরম অস্থিরতা চলছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর)। ঘুষ, নীতিমালা বহির্ভূত বদলি বাণিজ্য, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব সংস্থাটি এখন চরম ভাবমূর্তি সংকটে। রাজস্ব প্রশাসনের অভ্যন্তরে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র হতাশা ও অনিশ্চয়তা।

বহু কর্মকর্তা অভিযোগ করছেন, প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়া এখন নিয়ম নয়, বরং প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক অস্থির ও প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবতা।

নীতিমালা-বহির্ভূত বদলি: অস্থির প্রশাসন
২০২৫ সালের ৩ জুলাই নতুন সদস্য (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব নেন ১৫তম ব্যাচের এক কর্মকর্তা, যার পদোন্নতির পর থেকেই এনবিআরের ভেতরে শুরু হয় বদলি ও নিয়োগের ঝড়। সংস্থার অভ্যন্তরীণ নথি ও কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, গত কয়েক মাসেই প্রায় ১১ শতাধিক কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন—যা ইতিহাসে বিরল।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক বদলি নীতিমালা অনুসারে নয়, বরং “চাহিদা ও বিনিময়ের” ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে। কয়েকজন যুগ্ম কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, লোভনীয় পদে নিয়োগের বিনিময়ে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার ঘুষ গোপনে আদায় হয়েছে। আবার যারা এমন অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের “ডাম্পিং পোস্টিং” দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

একজন সহকারী কমিশনার বলেন, এখন বদলির চেয়ে বড় ব্যবসা আর কিছু নেই। একেকটি ফাইল মানে একেকটি দরদাম।
একইসঙ্গে এনবিআরের কর্মকর্তাদের অংশবিশেষ মনে করছেন, এই অস্থিরতা রাজস্ব সংগ্রহের সার্বিক কার্যক্রমকেও প্রভাবিত করছে। রাজস্ব ঘাটতির সময় এমন প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দেশের অর্থনীতির জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।


সিন্ডিকেটের ছায়া ও অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের ভেতরে একটি ‘বদলি সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে, যারা পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ বাণিজ্য চালাচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গত কয়েক মাসে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি।

এই খবর প্রকাশ্যে এলে প্রশাসনের একাংশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একাধিক সৎ কর্মকর্তা নীতিবহির্ভূত আদেশে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানান। সূত্র জানায়, একজন উপ-সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা রায়হান মেহেবুব দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করলে তাঁকে হঠাৎ করে বদলি করা হয়। এর পরপরই সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুগ্ম কমিশনার বলেন, আমরা আইন মেনে কাজ করতে চাই। কিন্তু এখন মনে হয় নৈতিকতা নয়, টাকা ও প্রভাবই একমাত্র যোগ্যতা।

এদিকে কিছু কর্মকর্তা জানান, বদলি বাণিজ্যে জড়িত কয়েকজন কর্মকর্তার নাম প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুরছে। এদের মধ্যে আছেন কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) থেকে শুরু করে কমিশনার পর্যায় পর্যন্ত। অভিযোগের তালিকায় ঘুষের অঙ্ক ২০ লাখ থেকে শুরু করে কমিশনার পর্যায়ে ৩-৫ কোটি টাকা পর্যন্ত।


রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, বদলি বাণিজ্যের পেছনে রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত ক্ষমতার ছায়া রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সদস্যকে একসময় এক প্রভাবশালী সাবেক মন্ত্রী ও একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত করা হতো।

এনবিআরের এক সাবেক চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
এনবিআর হলো সরকারের রাজস্বের হৃদপিণ্ড। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ও অনৈতিক প্রভাবশালী চক্রের কারণে এখন সেটি প্রায় পঙ্গু। বদলির নামে যা হচ্ছে, তা আসলে এক প্রকার প্রশাসনিক ব্যবসা।


দুদক সূত্রও জানায়,
 প্রশাসনের অভ্যন্তরে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থ লেনদেন ও সম্পদ অর্জনের তথ্য যাচাই চলছে। তবে তারা এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেননি, কারণ বেশ কিছু তথ্য যাচাই পর্যায়ে রয়েছে।

বিদেশে অর্থপাচার ও পারিবারিক সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন
রাজস্ব প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, এক সদস্যের পরিবারের বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় এবং সম্পদ ক্রয়ের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দাবি করা হয়েছে, তার এক সন্তানের যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার খরচ হুন্ডির মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়নি।

দুদকের এক সাবেক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
এই ধরনের তথ্য আমাদের কাছেও এসেছে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশে উচ্চমূল্যের শিক্ষা বা সম্পদ ক্রয় হলে তার উৎস যাচাই করা আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ।

তিনি আরও যোগ করেন, “অবৈধ লেনদেন বা হুন্ডির অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করা কঠিন হলেও এসব তথ্য যদি প্রাথমিকভাবে যাচাই হয়, তাহলে এটি দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরদারিতে আসতে পারে।


অধ্যাদেশ ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জারি হওয়া অধ্যাদেশে এনবিআর বিলুপ্ত করে “রাজস্ব নীতি” ও “রাজস্ব ব্যবস্থাপনা” নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর থেকেই সংস্থার ভেতরে দেখা দেয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অসন্তোষ।

এই অধ্যাদেশ বাতিল ও চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবিতে কর্মকর্তারা “কলম বিরতি”, “ধর্মঘট” এবং “মার্চ টু এনবিআর” কর্মসূচি পালন করেন। গুরুত্বপূর্ণ বাজেট প্রণয়নকালেও রাজস্ব কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলেন—যা এনবিআরের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন,
এনবিআরের মতো প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের আচরণ আগে দেখা যায়নি। এটি কেবল ব্যক্তিগত অসন্তোষ নয়, প্রশাসনিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার প্রতিফলন।

এনবিআরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একজন সদস্য স্বীকার করেন,
এটা সত্যি যে সংস্থার ভাবমূর্তি সংকটে আছে। কিছু কর্মকর্তার কারণে পুরো সংস্থাটাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ।


একজন কমিশনারের ভাষায়,
দুর্নীতিতে জড়িত না এমন কর্মকর্তা এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন। পার্থক্য শুধু কে ধরা পড়ছে আর কে পড়ছে না।”
আরেকজন দ্বিতীয় সচিব বলেন,
এখন এনবিআরে কাজ করি—এই পরিচয় দেওয়াটাই কখনো কখনো লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এদিকে এনবিআর কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে দুর্নীতি রোধের চেষ্টা করছে। ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা, অনলাইন অডিট, ভ্যাট রিফান্ড ও ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো চালু করা—সবই ঘুষ ও হয়রানি কমানোর জন্য।0

বিশেষজ্ঞ মত ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
প্রশাসন বিশ্লেষক ও করনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এনবিআরের বর্তমান সংকট কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, এটি কাঠামোগত সমস্যা। একদিকে রাজনৈতিক প্রভাব, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট—দুইয়ের চাপেই প্রশাসনের স্বচ্ছতা নষ্ট হচ্ছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. খালেদ মাহমুদ বলেন,
যে প্রতিষ্ঠানের ওপর পুরো অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে দুর্নীতি মানে রাজস্বের ক্ষতি নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনও। বদলির নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার এখন সবচেয়ে জরুরি।

দুদকের এক বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা মন্তব্য করেন,
এনবিআরের অভ্যন্তরে যদি ঘুষ বা অর্থপাচারের প্রমাণ মেলে, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


 স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার সময়
এনবিআরের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এখন শুধু একটি সংস্থার সমস্যা নয়, এটি দেশের রাজস্ব ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রশাসনের অভ্যন্তরে যদি সৎ কর্মকর্তারা নিরাপদ না বোধ করেন, তাহলে রাজস্ব আদায় ও নীতি বাস্তবায়ন—দুটিই ব্যাহত হবে।

অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার কাছে লিখিতভাবে হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তারা আশা করছেন, এনবিআরের প্রশাসনিক সংকট সমাধান না হলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

সুশাসনের প্রশ্নে এখন একটাই দাবি উঠছে—
“দুর্নীতিমুক্ত এনবিআর, স্বচ্ছ রাজস্ব প্রশাসন।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইউনেস্কোর সভাপতি নির্বাচিত হওয়া আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদ

1

জামালপুরে যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে নির্যাতনের দায়ে স্বামী ও শ

2

সিংগাইরে র‌্যাবের অভিযানে ১৪ কেজি গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক

3

৮০ কোটি টাকা কমিশন ডিসি-এসপির দপ্তরে

4

ইয়াবা পাচারে রেলওয়ে পুলিশের একাধিক সদস্যের নাম উঠেছে

5

গণপূর্তে নতুন নেতৃত্ব: ‘সততা ও দক্ষতার মিশেলে’ প্রধান প্রকৌশ

6

ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মাদক ব্যবসা: কুমিল্লায় যুবক আটক

7

বিপ্লব ও সংহতি দিবসে মোল্লাহাটে মহিলা দলের কর্মী সমাবেশ

8

আখাউড়ায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন:

9

আদালতের নির্দেশে এস আলম গ্রুপের ১,৯৩৬ একর জমি জব্দ,

10

বিটিআরসিতে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ

11

সাইফুজ্জামান শিখরের ছোট ভাই আশরাফুজ্জামান গ্রেপ্তার

12

সোনিয়া বশিরের প্রতারণায় স্টার্টআপ খাতে বিপর্যয়: তারানা হালিম

13

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে নিয়োগ–দুর্নীতির অভিযোগ: ওএসডি হলেন স

14

টেকনাফে গাঁজাসহ নারী মাদক কারবারী গ্রেফতার, মাদকের রুট নস্যা

15

রাজধানীর রাজউক কর্মকর্তাদের বিত্তবৈভব: অনুসন্ধান, অভিযোগ ও প

16

গণপূর্তে ‘ বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট, ভাঙতে চান মন্ত্রী-প্রতিমন

17

নাটোরের ‘হ্যাকার সিন্ডিকেট’: পরিচয় বদলে ব্ল্যাকমেইল — দেশজুড়

18

রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন সম্পন্ন

19

বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ভাইরাল, দুদকের

20