অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 23, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

সড়ক ও সেতুর টোল দুর্নীতি:

সড়ক ও সেতুর টোল দুর্নীতি: সাবেক আওয়ামী নেতাদের লুটপাটের সাম্রাজ্য উন্মোচিত


স্টাফ রিপোর্টার | 

দেশের রাজস্ব সংগ্রহের অন্যতম প্রধান উৎস হলো সড়ক ও সেতুতে আদায় হওয়া টোল। কিন্তু তথ্য বলছে, এটি একসময় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য হয়ে উঠেছিল অবৈধ আয়ের অন্যতম আকর্ষণীয় ক্ষেত্র। আধুনিক টোল ব্যবস্থাপনার নামে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব লুট হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, বর্তমানেও কি সেই লুটপাট থেমে আছে?

সাবেক নেতাদের কোম্পানির মাধ্যমে টোল সাম্রাজ্য :

সূত্র জানায়, আওয়ামী শাসনামলের প্রায় সাড়ে ১৫ বছর সময়ে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এবং গুম-খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানসহ একাধিক প্রভাবশালী নেতা নিজেদের ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে টোল আদায়ের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন।

অভিযোগ রয়েছে—তারা রাজনৈতিক সংযোগ ব্যবহার করে সরকারি সেতু ও সড়কের টোল আদায় কার্যক্রম নিজেদের প্রভাবাধীন কোম্পানির হাতে তুলে দেন। এসব কোম্পানির মধ্যে ইউডিসি কনস্ট্রাকশন, সিএনএস লিমিটেড, শামীম এন্টারপ্রাইজ, সেলভ্যান, রেগনাম রিসোর্সেস, এটিটি ও পেন্টা গ্লোবালের নাম পাওয়া গেছে।

তথ্য বলছে, এসব কোম্পানি ভারতীয় পার্টনার প্রতিষ্ঠান ভ্যান ইনফ্রা-এর সহযোগিতায় নানা কৌশলে সরকারের রাজস্ব আত্মসাৎ করত। সরকারি আয় থেকে তারা প্রায় ৫০ শতাংশ জমা দিত, আর বাকি ৫০ শতাংশ নিজেরা ভাগাভাগি করে নিত বলে অভিযোগ উঠেছে।

একক উৎসে চুক্তি ও সরকারের আর্থিক ক্ষতি : 

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে সিএনএস লিমিটেডকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া একক উৎসভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে যমুনা ও মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, কোম্পানিটি প্রায় ৪৮৯ কোটি টাকার বিল গ্রহণ করে ব্যাপক অনিয়ম করে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে অন্তত ৩০৯ কোটি টাকারও বেশি। এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক ছয়জন মন্ত্রী ও একাধিক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর টোল আদায়ের চুক্তি কীভাবে প্রতিযোগিতাবিহীন একক উৎসে দেওয়া হলো? কোথায় ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা?

দুর্নীতির কাঠামো ও রাজনৈতিক প্রভাব

তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ আমলে এসব কোম্পানির এমন প্রভাব ছিল যে, তাদের কার্যক্রম অডিট করাও অনেক সময় সম্ভব হয়নি। বরং টোল আদায় শেষে সরকারি হিসাবে অর্ধেক জমা দিয়ে বাকি অর্থ অন্য পথে সরিয়ে নেওয়া হতো।

এমনকি জুলাই বিপ্লবের পরও শেখ হাসিনার পতনের পর আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কোম্পানিগুলোর টোল নিয়ন্ত্রণে প্রভাব কমেনি। প্রশাসনের ভেতরের একটি অংশের সহায়তায় তারা এখনো অনেক টোলপ্লাজায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা : 

সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা বলেন, টোলের নামে প্রতিনিয়ত তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। তারা বলেন, “সরকারের নির্ধারিত টোলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দিতে হয়। কিন্তু কোনো হিসাবই ঠিকভাবে সরকারি খাতায় যায় না।”

একজন ট্রাকচালক জানান, “আমরা টোল দিই, কিন্তু সেতু বা সড়কের সুবিধা পাই না। কে টোল নিচ্ছে, সেই হিসাব কেউ জানে না।”

টিআইবি’র পর্যবেক্ষণ : 

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,

“আওয়ামী লীগ আমলে সাবেক মন্ত্রী বা রাজনীতিকদের প্রভাবে এ ধরনের দুর্নীতি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছিল। আমলাদের সক্রিয় যোগসাজশ না থাকলে এত বড় দুর্নীতি সম্ভব হতো না। রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।”

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ : 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন,

“রাজনৈতিক বিবেচনায় টোল আদায়ের কোম্পানি নির্বাচন করলে দুর্নীতি অবশ্যম্ভাবী। এসব কোম্পানি মেয়াদ শেষের পরও বছরের পর বছর অবৈধভাবে টোল আদায় চালিয়েছে, যার ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “এই খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাদ দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।”

পরিসংখ্যান যা বলছে : 

টিআইবি’র এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭১ শতাংশ পরিবার বিভিন্ন সেবা গ্রহণে দুর্নীতির মুখোমুখি হয়।

বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ)-এর সেবা গ্রহণে দুর্নীতির হার সবচেয়ে বেশি—৬৩ শতাংশেরও বেশি সেবা গ্রহীতা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন।

পরিবহন খাতে প্রতিবছর বাস-মিনিবাস অপারেটররা ঘুষ ও অবৈধ টোল বাবদ প্রায় ১,০৫৯ কোটি টাকা গুনছেন।

তথ্য বলছে, টোল খাতের দুর্নীতি শুধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নয়; এর সঙ্গে রাজনীতিক, আমলা ও প্রভাবশালী মহলের গভীর যোগসাজশ রয়েছে।

প্রশাসনিক উদাসীনতা ও প্রশ্নের পর প্রশ্ন

প্রশ্ন উঠছে—
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎসের অডিট, নিরীক্ষা ও তদারকির ব্যবস্থা দীর্ঘদিন কার্যকর ছিল না?

প্রতিযোগিতাহীন দরপত্রে একক কোম্পানিকে টোল আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হলো কেন?

প্রশাসনের কোন পর্যায়ে এসব অনিয়ম থামানোর উদ্যোগ ব্যর্থ হলো?

রাজনৈতিক প্রভাব কি এখনো টোল আদায় খাতে সক্রিয়?

একাধিক সূত্র জানায়, টোল আদায়ের নতুন দরপত্রগুলো এমনভাবে প্রণয়ন করা হচ্ছে যাতে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে না পারে। এতে পুরোনো সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

রাজস্ব ক্ষতি ও জনস্বার্থের বিপর্যয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, টোল খাতে দুর্নীতি মানে শুধু অর্থ হারানো নয়—এটি উন্নয়ন, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও জনসেবায় এক বিশাল ধাক্কা।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সড়ক ও সেতু উন্নয়নে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু টোলের অর্থ যদি ঠিকভাবে সরকারি তহবিলে না যায়, তাহলে জনগণের করের চাপ আরও বেড়ে যায়, প্রকল্প ব্যাহত হয়, আর উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে।


তথ্য বলছে, টোল আদায়ের নামে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা দুর্নীতি এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দুদক মামলা, টিআইবি প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক তদন্তে প্রমাণ মিলেছে—এই খাত রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণে বিপর্যস্ত।

প্রশ্ন উঠছে, এই অস্বচ্ছ ব্যবস্থার অবসান কবে হবে? সরকারের উচিত হবে, টোল ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর করা, সব টোলপ্লাজাকে স্বয়ংক্রিয় হিসাব ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে কঠোর অডিট চালু করা।

নচেৎ, সড়ক ও সেতু শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়—রাজস্ব লুটের প্রতীক হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ব্যাপক বিক্ষোভের পর ইন্দোনেশিয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার

1

নুরুল হকের ওপর হামলার ঘটনায় তারেক রহমানের নিন্দা, তদন্তের আহ

2

১৫ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ, প্রজ্ঞাপন জারি

3

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন: ২৩২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা, তাল

4

জুলাই সনদ নিয়ে টানাপোড়েনে সরকার

5

সেনাপ্রধানের সঙ্গে তুরস্কের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

6

ঠিকাদারি ও বদলি বাণিজ্যের হোতা গণপূর্তের বদরুল

7

নতুন তালিকায় ভিসা ছাড়াই ৩৬ দেশে যেতে পারবেন বাংলাদেশিরা

8

হামে মৃত্যু ও টিকার ঘাটতি নিয়ে সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ রুমিন ফার

9

খুলনা নতুন জেলা কারাগার প্রকল্প: উন্নয়নের মুখোশের আড়ালে দুর্

10

রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন সম্পন্ন

11

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী দুই পক্ষের

12

সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিদেশি সম্পদ, ২৩ বস্তা নথি উদ্ধার

13

স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে সংস্কার কাজের নামে অনিয়মের অভিযোগ:নির্

14

সৌন্দর্য নষ্ট করবে, তাদের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক রেট অনুযায়ী জরি

15

বাকৃবি উদ্ভাবিত ‘ডাক প্লেগ ভ্যাকসিন’ হাঁস চাষিদের মুখে হাসি

16

আস্থার সংকটে গ্রাহকরা ‘ওবিই’ ইকবাল আবার এনআরবি’র চেয়ারম্যান

17

আয়ের টানাপোড়েনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও রিকশা চালকরা

18

মোংলায় পিস অর্গানাইজেশনের উদ্যোগে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প

19

জুলাই বিপ্লবের সুফলভোগী আমরা আবু সালেহ আকন

20