‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ও পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সাবেক সচিব প্রশান্ত কুমার রায়ের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (৩ ডিসেম্বর) কমিশনের সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র।
দুদক সূত্র জানায়, প্রশান্ত কুমারের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণীতে প্রায় সাড়ে এক কোটি টাকার তথ্য গোপন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিপুল অংকের সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগপত্র অনুমোদনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর পথ প্রশস্ত হলো।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্রশান্ত কুমার দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে এক কোটি ২০ লাখ ৯৩ হাজার ৩৫১ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপন করে তিনি একটি “মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর ঘোষণা” দিয়েছেন—এমন অভিযোগ আনা হয়েছে চার্জশিটে।
দুদকের একজন উপপরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের সম্পদের তথ্য গোপন করা গুরুতর অপরাধ। অনুসন্ধানে আমরা গোপনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, প্রশান্ত কুমারের ঘোষিত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৭৭ লাখ ৫৩ হাজার ৭৬৭ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের অস্তিত্ব। দুদক বলছে, এসব সম্পদ অসাধু উপায়ে অর্জিত হয়েছে—এমন প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব সম্পদ ভোগদখলে রাখার অভিযোগেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
দুর্নীতি বিরোধী সংগঠনের এক কর্মকর্তা জানান,
“একজন সাবেক সচিবের আয় ও সম্পদের মধ্যে এই ধরনের ফাঁক রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
চার্জশিটে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হিসেবে উঠে এসেছে ব্যাংক লেনদেন। দুদকের তথ্য বলছে, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ আড়াল করতে প্রশান্ত কুমার নিজের ও তাঁর মেয়েদের নামে ১২টি ব্যাংক হিসাব খুলে প্রায় ১৮ কোটি ৫৩ হাজার ৭১৯ টাকার লেনদেন করেন। এসব লেনদেনের বৈধ উৎসের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি।
সূত্র জানায়, এসব হিসাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অংকের টাকা জমা ও উত্তোলনের ঘটনাও তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও গভীর করেছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এক উপদেষ্টা এ বিষয়ে বলেন,
“একাধিক হিসাবে পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে বিপুল অংকের অর্থ ঘোরাফেরা সাধারণত অর্থপাচারের ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের লেনদেন গভীর তদন্ত দাবি করে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, প্রশান্ত কুমার রায়ের গ্রামের বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটা থানার গোপ্তমারী এলাকায়। বর্তমানে তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুরের কাদিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে বসবাস করছেন।
সূত্র জানায়, শিগগিরই দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করবেন।
‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পটি দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পের সাবেক পরিচালকের বিরুদ্ধে বিপুল আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
প্রকল্পের সাবেক কয়েকজন উপকারভোগী অভিযোগ করে বলেন,
“অনেক জায়গায় প্রকল্পের পুরো সুবিধা আমরা পাইনি। ফাইল আটকে থাকত, টাকা ছাড় পেতে দেরি হতো। এখন এসব অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ায় বুঝতে পারছি, কোথায় গরমিল ছিল।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একজন গবেষক বলেন,
“এ ধরনের মামলায় চার্জশিট অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে শুধু মামলা নয়, দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে দুর্নীতির সংস্কৃতি বন্ধ হবে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এক সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির বড় পরীক্ষা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনও সরকারি পদে না থাকলেও, একসময় তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন—এটি বিষয়টির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন বলেও জানিয়েছেন আইনজ্ঞরা।
মন্তব্য করুন