বিশেষ প্রতিবেদন |
অফশোরের অন্ধকারে এক ব্যাংক চেয়ারম্যান
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বড় এক নাম ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি। দেশজুড়ে পরিচিত এর চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী — যিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রভাবশালী অবস্থানে আছেন। কিন্তু এখন তিনি আলোচনায় অন্য কারণে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—শওকত আলী চৌধুরীর মালিকানাধীন এস. এন. করপোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি বাণিজ্যে অস্বচ্ছতা, ব্যাংকিং নীতিমালা লঙ্ঘন ও অর্থ পাচারের সম্ভাবনার ইঙ্গিত।
সবকিছুর সূত্রপাত এক জায়গা থেকে—ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড (British Virgin Islands)। এই ছোট্ট করস্বর্গেই নিবন্ধিত তিনটি কোম্পানি থেকে জাহাজ কিনেছে এস. এন. করপোরেশন। কিন্তু সেই কোম্পানিগুলোর প্রকৃত কোনো কার্যক্রম বা অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।
একই ঠিকানায় তিন কোম্পানি, তিনটি জাহাজ
বিএফআইইউর প্রতিবেদনের তথ্য বলছে—২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চট্টগ্রাম শাখা এস. এন. করপোরেশনের পক্ষে তিনটি ঋণপত্র (এলসি) স্থাপন করে। বেনিফিসিয়ারি প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো— Red Ruby Group Ltd. Talent Mile Ltd. Columbia Seas Ltd.
তিনটিই ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত, এবং অবাক করার বিষয়—সবগুলোর ঠিকানা, ইমেইল যোগাযোগ, এমনকি রেজিস্ট্রার নম্বরও প্রায় অভিন্ন।
বিএফআইইউ বলছে, এই তিন প্রতিষ্ঠান বাস্তবে কার্যকর নয়—তাদের শারীরিক উপস্থিতি বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কোনো প্রমাণ নেই। তদন্তকারীরা এই ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ‘শেল কোম্পানি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।এই কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এস. এন. করপোরেশন “পুরনো জাহাজ” আমদানি করেছে বলে এলসি নথিতে উল্লেখ আছে, কিন্তু কোন বন্দরে জাহাজ হস্তান্তর হয়েছে, কিংবা জাহাজগুলো সত্যিই অস্তিত্বে আছে কিনা, তারও নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি।
ব্যাংকিং নীতির লঙ্ঘন—এনহ্যান্সড ডিউ ডিলিজেন্স (EDD) কোথায়?
বাংলাদেশ ব্যাংকের Guidelines for Foreign Exchange Transactions-2018 স্পষ্ট করে বলে, উচ্চঝুঁকির দেশ যেমন ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, পানামা, সেশেলস, মরিশাস, কেম্যান আইল্যান্ডস ইত্যাদির সঙ্গে যেকোনো বাণিজ্যিক লেনদেনে ব্যাংককে অবশ্যই Enhanced Due Diligence (EDD) প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
অর্থাৎ, অর্থের উৎস, প্রাপকের প্রকৃত মালিকানা, এবং পণ্যের বাস্তব ডেলিভারি যাচাই না করে কোনো লেনদেন করা যাবে না।
কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এই নিয়ম উপেক্ষা করে তিনটি এলসি খুলেছে। বিএফআইইউর প্রতিবেদনে লেখা আছে—No documentary evidence found of EDD procedures being conducted by Standard Chartered Bank while dealing with S.N. Corporation’s LCs with high-risk BVI entities.
এমন আচরণ কেবল নীতিলঙ্ঘন নয়, বরং অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘনও বটে।
গন্তব্যহীন জাহাজ ও আন্তর্জাতিক বিভ্রান্তি
এস. এন. করপোরেশনের এলসি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ১৪১টি এলসি খোলা হয়েছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ১১টি জাহাজের গন্তব্য ছিল না চট্টগ্রাম বন্দর।কয়েকটি জাহাজের নাম ও মালিকানা একাধিকবার পরিবর্তন হয়েছে।আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক তথ্যভান্ডার Lloyd’s List-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিএফআইইউ বলছে—Several vessels purchased under S.N. Corporation’s LCs show inconsistent ownership records and port destinations, raising suspicion of trade-based money laundering.অর্থাৎ, “জাহাজ আমদানি” প্রক্রিয়া ব্যবহার করে অর্থ অন্যত্র স্থানান্তরের আশঙ্কা প্রবল।
অর্থনীতিবিদ ও প্রাক্তন ব্যাংকার ড. মো. আব্দুল হালিম বলেন,
এটি স্পষ্টভাবে ট্রেড-বেইসড মানি লন্ডারিংয়ের লক্ষণ। একটি কোম্পানি বারবার একই ঠিকানা থেকে পুরনো জাহাজ কিনছে, অথচ জাহাজগুলো দেশে ঢুকছে না—এটি বাণিজ্য নয়, এটি অর্থ স্থানান্তরের কৌশল।
২৮ ব্যাংকে ১৮৭টি হিসাব—অস্বাভাবিক আর্থিক প্রবাহ
বিএফআইইউর বিশ্লেষণ অনুসারে, শওকত আলী চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের নামে দেশে ২৮টি ব্যাংকে ১৮৭টি হিসাব রয়েছে।
এর মধ্যে—শওকত আলীর নামে ১৪টি,স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারীনের নামে ১৫টি,কন্যা যারা নামরীনের নামে ৯টি,পুত্র জারান আলীর নামে ৩টি,এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ১৪৬টি।চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এই সব হিসাবে জমা হয়েছে ৮,৪০৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা, এবং উত্তোলন হয়েছে ৮,২৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
বর্তমানে মোট স্থিতি প্রায় ১৭৩ কোটি টাকারও বেশিবিএফআইইউর ভাষায়,Transaction patterns suggest circular movement of funds among related accounts, indicating layering techniques often used for money laundering. অর্থাৎ, একই গোষ্ঠীর একাধিক হিসাবের মধ্যে অর্থ ঘুরছে—যা ‘লেয়ারিং’-এর কৌশল।
ব্যাংকের ভেতরেই ব্যাংক—প্রভাবের অভিযোগ এস. এন. করপোরেশনের লেনদেন ঘিরে আরও বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা ব্যাংক (জুবিলি রোড শাখা): ২০০৪–২০১৭ সালের মধ্যে শওকত আলীর ব্যক্তিগত প্লাটিনাম হিসাব থেকে প্রায় ৩৯৮ কোটি টাকার জমা ও উত্তোলন হয়েছে। এই হিসাব তাঁর ব্যক্তিগত হলেও, ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার হয়েছে—যা কর ফাঁকি ও হিসাব গোপনের ইঙ্গিত। ইস্টার্ন ব্যাংক (আগ্রাবাদ শাখা): ব্যাংকের কোম্পানি সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ আল মামুন ১২৫ বার শওকতের ব্যক্তিগত হিসাব থেকে নগদ অর্থ উত্তোলন করেছেন। একই কর্মকর্তা তাঁর মেয়ের হিসাব থেকেও ৯৮ বার উত্তোলন করেছেন। মিডল্যান্ড ব্যাংক, মিউচুয়্যাল ট্রাস্ট ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক: এসব ব্যাংকের মাধ্যমে এস. এন. করপোরেশন থেকে পরিবারের সদস্যদের হিসাবে নিয়মিত অর্থ স্থানান্তরের প্রমাণ মিলেছে। প্রিমিয়ার ব্যাংক (আগ্রাবাদ শাখা): প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ২৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার ঋণ (LTR) প্রদান—যা স্পষ্টভাবে নিয়মবহির্ভূত।
একজন সিনিয়র ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শওকত আলী চৌধুরী যেসব ব্যাংকে প্রভাব রাখেন, সেখানে ঋণ অনুমোদন, নগদ উত্তোলন ও এলসি খোলার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয় না। অনেক সময় ফোন কলেই অনুমোদন আসে।
কর্পোরেট নৈতিকতা ও দ্বৈত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
একজন ব্যাংকের চেয়ারম্যানের নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থাকতেই পারে, কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন সেই পদ ব্যবহার করে নিজ স্বার্থে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়।
অর্থনীতিবিদ ড. নাজমুল হাসান বলেন—যদি একজন ব্যাংক চেয়ারম্যান তার প্রভাব ব্যবহার করে নিজ প্রতিষ্ঠান বা পরিবারের প্রতিষ্ঠানের লেনদেনে প্রভাব ফেলেন, সেটি ‘Conflict of Interest’। এটি কেবল নৈতিক নয়, ব্যাংকিং শৃঙ্খলার জন্যও বিপজ্জনক।বিশ্লেষকরা বলছেন, শওকত আলী চৌধুরী শুধু একজন ব্যাংক চেয়ারম্যানই নন, তিনি ব্যাংক পরিচালনা পরিষদের একাধিক কমিটির সদস্য, এমনকি ঋণ অনুমোদন বোর্ডেও প্রভাবশালী। ফলে তাঁর পরিবারের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রমে ‘নিরপেক্ষতা’ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া স্বাভাবিক।
দুদক ও বিএফআইইউর অনুসন্ধান—প্রথম ধাপ শুরু
বিএফআইইউ ইতোমধ্যেই শওকত আলী চৌধুরী, তাঁর পরিবার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব ব্যাংক হিসাব সতর্ক নজরদারিতে রেখেছে।
দুদকও প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে, যেখানে অন্তত ৮ হাজার কোটি টাকার লেনদেন পর্যালোচনায় রাখা হয়েছে।দুদকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,আমরা এখন ব্যাংক ও কাস্টমস সূত্রে লেনদেনের বৈধতা যাচাই করছি। যদি প্রমাণিত হয় যে এলসির মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাঠানো হয়েছে কিন্তু পণ্য বাস্তবে আসেনি, তাহলে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা দায়ের হবে।অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, এমন অপরাধে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে।
নীরব চেয়ারম্যান—প্রশ্নের জবাব নেই
ইস্টার্ন ব্যাংক চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তাঁর মোবাইল নম্বরে কল দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়, পরে লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ সম্পর্কে ইস্টার্ন ব্যাংকের করপোরেট কমিউনিকেশন বিভাগও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট—অফশোর সংযোগে বাংলাদেশের ঝুঁকি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিগত এক দশকে বাংলাদেশের অন্তত ১৩০টি কোম্পানি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সেশেলস ও পানামা থেকে পণ্য আমদানির এলসি খুলেছে।এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি কোম্পানির মালিক বা পরিচালক দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা ব্যাংক কর্মকর্তা।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষকরা বলেন—অফশোর নিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর মূল উদ্দেশ্য কর ফাঁকি, সম্পদ গোপন ও অর্থ পাচার। যখন কোনো দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের শীর্ষ ব্যক্তিই এমন প্রক্রিয়ায় জড়িত হন, তখন সেটি গোটা আর্থিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে আঘাত করে।
আগামীর প্রশ্ন—নজরদারি না নীরবতা?
দুদক ও বিএফআইইউর অনুসন্ধান এখন প্রাথমিক ধাপে।
কিন্তু একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা, কাস্টমস কর্মকর্তা এবং শিপিং এজেন্ট ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় এসেছে।
তদন্তকারীরা এখন যাচাই করছেন—এস. এন. করপোরেশনের নামে যে জাহাজগুলো কেনা হয়েছে, সেগুলো আদৌ দেশে এসেছে কি না, এবং এসেছে হলে কোথায় নোঙর করেছে।অন্যদিকে, ইস্টার্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও এখন বিব্রত।একজন পরিচালক বলেন,চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত ব্যবসা নিয়ে অভিযোগ উঠলে সেটি ব্যাংকের ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলে। আমরা চাচ্ছি, তিনি নিজেই বিষয়টি পরিষ্কার করুন।
আর্থিক নৈতিকতার পরীক্ষায় শওকত আলী চৌধুরী
ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের সন্দেহভাজন তিন কোম্পানির মাধ্যমে জাহাজ কেনা, ৮ হাজার কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন, এবং একাধিক ব্যাংকে প্রভাবের ইঙ্গিত—সবকিছুই এখন এক ব্যক্তিকে ঘিরে।
ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী আজ শুধু একজন ব্যবসায়ী নন, তিনি এখন বাংলাদেশের আর্থিক শৃঙ্খলার এক পরীক্ষাকেন্দ্র।
তদন্ত সংস্থাগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে—
এই ঘটনাগুলো কি কেবল বাণিজ্যিক কৌশল, নাকি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক বহুমাত্রিক আর্থিক অনিয়মের জাল?