অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Dec 3, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

একই তলায় দুবার চুক্তি—কুষ্টিয়া মেডিকেল প্রকল্পে বিস্ময়কর অনিয়ম


স্টাফ রিপোর্টার | 

বাংলাদেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ বলেই অনেকের মত। কিন্তু কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে সেই ব্যয়ের পরিমাণ এবং অনিয়মের অভিযোগ প্রশ্ন তুলেছে বিশেষজ্ঞদের।

তথ্য বলছে—২৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প শেষ হতে সময় লেগেছে ১১ বছর, ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৮২ কোটি টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৪০৭ কোটি টাকা, যা মূল প্রকল্পের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি।

অভিযোগ উঠেছে—এই ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে অনিয়ম, অনুমোদনবহির্ভূত কাজ, কাজ না করেও বিল পরিশোধ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং ডিপিপি–বহির্ভূত নতুন কাজ যুক্ত করার কারণে।

আরও উদ্বেগজনক—দায়ীদের তালিকায় থাকা অধিকাংশ কর্মকর্তা তদন্তের বাইরে থেকে গেছেন। উল্টো প্রকল্পে স্বল্প সময় দায়িত্ব পালন করা মাত্র দুজন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


প্রকল্প ব্যয় তিন গুণ: কোথায় গেল অতিরিক্ত ৪০৭ কোটি টাকা?
সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়—খাত বাড়তি ব্যয় (কোটি টাকা)

মেডিকেল যন্ত্রপাতি ১০১
হাসপাতাল ভবন নির্মাণ ১০০
ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল ৪০
সীমানা প্রাচীর ও ভূমি উন্নয়ন ৪০
নতুন সংযোজিত বিভিন্ন খাত ৬৩

অভিযোগ উঠেছে—মেডিকেল যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে বেশি দামে ক্রয়, নিম্নমানের পণ্য এবং স্পেসিফিকেশন পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতির বড় অংশই এখন অচল বলে জানা যায়।


হাসপাতাল ভবন নির্মাণ: ৭ তলার প্রকল্প ৩ তলায় নামিয়ে চুক্তি
প্রকল্পের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো হাসপাতাল ভবন নির্মাণ।

তথ্য অনুযায়ী— অনুমোদিত ডিপিপিতে বাজেট ছিল ১১২ কোটি টাকা।
দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১৪ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী।৭ তলার জায়গায় ৩ তলা পর্যন্ত কাজের দরপত্র হয়।ঠিকাদারের পক্ষে ফ্রন্ট–লোডেড দর দেখিয়ে ব্যয় বাড়ানো হয়। উচ্চমূল্যের আইটেমে কাজের পরিমাণ বাড়িয়ে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ।রং, টাইলস, সুইচ–বোর্ডের মতো আইটেম কমিয়ে ব্যয় কম দেখানো।
সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে দ্বিতীয় পর্যায়ের দরপত্র আহ্বানে “পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে” স্থানীয় অফিস উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দরপত্র প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন।
একই তলার নির্মাণে দুবার চুক্তি—‘অস্বাভাবিক’ বলছেন প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা

অভিযোগ উঠেছে—
একাডেমিক ভবনের পঞ্চম তলা নির্মাণে দুবার একই ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করা হয়।
একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ  আমাদের প্রশ্নের জবাবে বলেন—
একই শারীরিক কাজের জন্য দুইবার চুক্তি—এটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি পরিকল্পিত আর্থিক অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন উঠছে—কেন এত বড় ভুল কেউ ধরল না?
তথ্য বলছে, এই কাজে জড়িত প্রকৌশলী বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল ও সীমানা প্রাচীর: অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ।ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজে ৩৮.৫০ কোটি টাকা। সীমানা প্রাচীর ও ভূমি উন্নয়ন কাজে ৩৬.৫০ কোটি টাকা।

অভিযোগ উঠেছে—
ডিপিপির চেয়ে কম কাজ করা হলেও পুরো টাকা বিল করা হয়েছে। ভেরিয়েশন অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়।


মাস্টারমাইন্ডের তালিকা, তদন্তে অন্তর্ভুক্ত হয়নি—অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন—
অনিয়মের বড় অংশ পরিচালনা করেছেন সাবেক সচিবের ঘনিষ্ঠ কিছু প্রকৌশলী। তদন্তে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। উল্টো যাঁরা ভিন্নমতাবলম্বী ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।


স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রকল্প দুর্নীতি তদন্তে এমন পক্ষপাতের অভিযোগ নতুন নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর: প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকায় প্রশ্ন।
তদন্ত কমিটি বলছে—
প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের,তবে তারা নিয়মিত মনিটরিং করেনি,
গুরুত্বপূর্ণ নকশা পরিবর্তনও হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নির্দেশে।

প্রশ্ন উঠছে—
দায়িত্ব যখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কেন নেই?


দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—বাকি সবাই ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে’
তথ্য বলছে—
প্রকল্পে অন্তত ১৬–১৮ জন বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন
এর মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী ৫ জন, তত্ত্বাবধায়ক ৫ জন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ৬ জন।
কিন্তু অভিযুক্ত করা হয়েছে মাত্র দুজনকে

একজন দুর্নীতিবিষয়ক গবেষক বলেন—
এটি ‘সিলেকটিভ অ্যাকশন’। তদন্তে মূল চরিত্রেরা বাদ গেলে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম ঠেকানো যাবে না।


কমিটির আহ্বায়ক কী বলছেন?
তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিন বলেন—
আমরা কারা দায়ী তা শনাক্ত করেছি। ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন ও আইন শাখার। কী ব্যবস্থা নেবে, তা তারাই নির্ধারণ করবে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
যখন ২৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প ৬৮২ কোটিতে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু ‘অব্যবস্থা’ নয়; এটি ব্যবস্থার ভেতর পরিকল্পিত দুর্নীতির লক্ষণ।

প্রশ্ন উঠছে—কে বা কারা এই অনিয়মে লাভবান হলো?
কেন প্রকল্পের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা তদন্তের বাইরে?
রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের বিচার কি কখনো হবে?
আর ১১ বছরের বিলম্বে জনসেবা কি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি?

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঘাটাইলে দাফনের ৩৭ দিন পর লাশ উত্তোলন

1

টিউলিপ রিজওয়ানা ও সরদার মোশাররফের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানি

2

ভুয়া আইডি খুলে প্রতারণা, মামলার পর থেকে পলাতক ল্যাব সহকারী অ

3

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ব্যয় নিয়ে তোলা অভিযোগ ভিত্তিহীন: কমিশনে

4

৯ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির ভ্যাট গোয়েন্দার অভিযান

5

সোশ্যাল মিডিয়ায় জুয়া: তরুণ প্রজন্মের নীরব শিকার

6

কিশোরগঞ্জে আবাসিক হোটেলে যুবকের মরদেহ

7

গাজাযুদ্ধে ১৯ হাজার শিশু হত্যা করেছে ইসরায়েল

8

আপেল হয়ো না’ জয়া আহসানের নতুন ফ্যাশন অভিব্যক্তিতে নেটদুনিয

9

কেসিসির প্রশাসক হিসেবে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর দায়িত্ব গ্রহণ

10

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আরব আমিরাতের শেয়ারবাজারে বড় ধস

11

ডাকসু নির্বাচনে থাকছে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’সহ ৩ স্তরের নিরাপত্ত

12

খুলনায় নেশার টাকা না পেয়ে পিতাকে হত্যা:

13

ঢাকায় খুলনাবাসীর বৃহত্তম প্ল্যাটফর্মে নতুন কমিটি—ঐক্য ও উন্ন

14

কারাগারে চিকিৎসা সংকট: সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে বাড়ছে বন্দিদের

15

হজ ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সভা অনুষ্ঠিত

16

বেনাপোলে কসাই হত্যাকাণ্ড: প্রশ্নের চেয়ে উত্তর কম

17

বাউফলে দেড় বছরের শিশুর মৃত্যু: কলার টুকরো আটকে প্রাণহানি

18

কুমিল্লায় র‌্যাবের অভিযানে ২৬ কেজি গাজা উদ্বার। এক নারীসহ আট

19

অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা: গভর্নরের সিদ্ধান্তে আস্থা হারাচ

20