এলজিইডির প্রকল্প পরিচালক হামিদুল হক: অভিযোগে দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও অঢেল সম্পদের মালিকানা
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম বড় সংস্থা। প্রতি বছর এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই এলজিইডিকে ঘিরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ জনমনে প্রশ্ন তুলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছেন এলজিইডির দ্বিতীয় নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পের (সিআরডিপি-২) প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. হামিদুল হক। তার বিরুদ্ধে এক লিখিত অভিযোগ সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থায় জমা পড়েছে। অভিযোগকারী মো. হেমায়েত উদ্দিন নামের ব্যক্তি দাবি করেছেন, হামিদুল হক নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদার নিয়োগ, কমিশন বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতিকে নিয়মিত প্রথায় পরিণত করেছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হামিদুল হক নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। সেই সিন্ডিকেট ছাড়া কেউ কাজ পায় না। টেন্ডারে অংশ নিতে চাইলে ১০–১২ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। প্রকল্পের কাজের গুণগত মান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগকারী হেমায়েত উদ্দিন বলেন, সিআরডিপি-২ প্রকল্পের শুরু থেকে হামিদুল হকের হাতে এক ধরনের দুর্নীতির চক্র গড়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছায়ায় থেকে তিনি অনিয়ম করেছেন। প্রকল্পের আদ্যোপান্ত তদন্ত করলে দুর্নীতির প্রমাণ মিলবেই।
তথ্য বলছে, হামিদুল হক আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের (এলজিইডি শাখা) সক্রিয় সদস্য। সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। ফলে প্রকল্প পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ তিনি সহজেই পান।
একজন এলজিইডি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
হামিদুল হক প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলেও তার পরিচয় কেবল প্রকৌশলী নয়, রাজনৈতিকভাবেও প্রভাবশালী। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যোগাযোগই তার আসল শক্তি।
প্রশ্ন উঠছে—একজন সরকারি প্রকৌশলী কীভাবে দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এতটা সক্রিয় থাকতে পারেন? তার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি কোথায়?
অভিযোগপত্রে হামিদুল হক ও তার পরিবারের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তালিকা উঠে এসেছে—
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটিতে বহুতল বাড়ি ‘হামিদ ভিলা’।
সলিমুল্লাহ রোডে স্ত্রী আরমানা ইসলামের নামে আরেকটি বাড়ি।
শেখের টেক এলাকায় প্যারামাউন্ট হাউজিংয়ের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
নামে-বেনামে একাধিক প্রাইভেট কার। বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর।
গ্রামের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ জমি ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ।
তথ্য বলছে, এ সম্পদ তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন,টেন্ডার জমা দিলেই কমিশন চাইত। ১০ থেকে ১২ শতাংশ না দিলে কাজ পাওয়া যেত না। বাধ্য হয়ে দিতাম। কারণ অন্যথায় কাজ বাতিল হয়ে যেত।
অন্য একজন যোগ করেন,নিজস্ব সিন্ডিকেট ছাড়া কেউ কাজ পেত না। যেসব ঠিকাদারকে কাজ দিতেন, তারাই কমিশন দিয়ে টিকে থাকত।
প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও স্থানীয়দের অসন্তোষ আছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার এক বাসিন্দা বলেন,প্রকল্পের কাজ অর্ধেকেই শেষ হয়ে গেছে। রাস্তার ড্রেনের স্ল্যাব কয়েক মাসের মধ্যেই ভেঙে পড়েছে। অথচ সব বিল পরিশোধ হয়ে গেছে।
একজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন,এলাকার রাস্তা খুঁড়ে বছরের পর বছর কাজ শেষ হয় না। বৃষ্টিতে পানি জমে যায়, আমরা ভোগান্তিতে পড়ি। অথচ সরকারি হিসেবে সব কাজ নাকি শেষ!
অভিযোগ অনুযায়ী, হামিদুল হক বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য হওয়ার সুবাদে সবসময় ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থেকেছেন। সূত্র জানায়, তিনি নিয়মিত আওয়ামী লীগের সভা-সমাবেশে দান করতেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য হিসেবেও নাম ওঠে তার।
তথ্য বলছে, এই রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করেই তিনি প্রশাসনিক পদে টিকে থেকেছেন এবং প্রকল্পে অনিয়ম চালিয়ে গেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক হামিদুল হক বলেন,
যদি সুনির্দিষ্ট কিছু থাকে, সে বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে। অভিযোগের বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নাই।
তার সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমার যা কিছু আছে, সব ট্যাক্স ফাইলে উল্লেখ আছে। আমার স্ত্রী একজন চিকিৎসক। এর বাইরে আমি কিছু বলতে চাই না।
প্রশ্ন উঠছে—বছরের পর বছর অভিযোগ থাকার পরও কেন দুদক বা অন্য কোনো সংস্থা তদন্তে নামেনি? অভিযোগকারী হেমায়েত উদ্দিনের দাবি,
দুদককে রাজনৈতিক প্রভাবিত না হয়ে কাজ করতে হবে। তদন্ত হলে হামিদুল হকের অঢেল সম্পদের প্রমাণ মিলবে।”
একজন আইন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন,বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রভাবিত আমলাতন্ত্র দুর্নীতির মূল উৎস। জবাবদিহি ছাড়া এ ধরনের দুর্নীতি থামবে না।
তথ্য বলছে, হামিদুল হক রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে অঢেল সম্পদ গড়েছেন। সূত্র জানায়, নাম-বেনামে জমি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক আমানত ও বিলাসবহুল গাড়ির মালিক তিনি।
প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কি এবার এই অভিযোগে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে? নাকি রাজনৈতিক ছায়ায় আড়ালেই থেকে যাবে দুর্নীতির এই সাম্রাজ্য?
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এলজিইডির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত হোক। যারা দুর্নীতি করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তর করছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হোক।