বিশেষ প্রতিনিধি |
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর বিভাগের অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) শাহ মোহাম্মদ মারুফকে ঘিরে সম্প্রতি যে অভিযোগ উঠেছে, তা বাংলাদেশের কর প্রশাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তথ্য বলছে, প্রায় দেড় দশক আগে ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তা বর্তমানে ৫ম গ্রেডের সরকারি পদে অধিষ্ঠিত, যার বৈধ আয় সামগ্রিকভাবে ৮০ লাখ টাকার মতো। তবে তার আয়কর নথিতে দেখা যাচ্ছে সম্পদের পরিমাণ চার কোটিরও বেশি। কিন্তু অনুসন্ধানকারী সংস্থাগুলো বলছে, নাম-বেনামে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকার কাছাকাছি।
এনবিআরের ভেতরে-বাইরে এখন যে প্রশ্ন উঠছে—একজন সরকারি কর্মচারী কীভাবে তার বৈধ আয় অতিক্রম করে এত বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারেন?
এই প্রশ্নই বর্তমানে বাংলাদেশের কর প্রশাসনের মূল্যায়ন ও সুশাসন-সংকটকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এনে দাঁড় করিয়েছে শাহ মোহাম্মদ মারুফকে।
বারিধারার ১২ কোটি টাকার ফ্ল্যাট, অনুসন্ধানের সূচনা, ঢাকার বারিধারা কূটনৈতিক জোন। দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। এখানকার প্রতিটি ইঞ্চি জমি কোটি টাকায় হিসাব হয়। সেখানেই সাততলায় ৩,২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন অতিরিক্ত কর কমিশনার শাহ মোহাম্মদ মারুফ।
ভবনটির নাম ‘বিটিআই উইন্ড ফ্লাওয়ার’, যার প্রতিটি তলায় একটি করে ইউনিট। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রতি বর্গফুটের দাম ছিল প্রায় ৪০ হাজার টাকা। ফলে এই ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য দাঁড়ায় ১২ কোটি টাকার বেশি।
কিন্তু মারুফের বার্ষিক বৈধ আয়ের সঙ্গে এই ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য পাওয়া যায় না। সূত্র জানায়, ফ্ল্যাটটি স্ত্রীর নামে কেনা হলেও এখনও এর নিবন্ধন সম্পন্ন হয়নি—যা কর আইনের আলোচনায় নতুন আরেক প্রশ্ন তুলেছে।
স্ত্রীর আয়কর নথি, অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত
মারুফের স্ত্রী সাদিয়া আফরিন একসময় চাকরি করতেন একটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানে। পান্থপথের সেই অফিসে গিয়ে দেখা মেলে ধুলোমাখা টেবিল-চেয়ার আর নথির স্তূপ। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন:
“সাদিয়া আপা বছরখানেক আগে চাকরি ছেড়েছেন। সবশেষ তিনি বিক্রয় বিভাগের সহকারী ম্যানেজার ছিলেন।
তথ্য বলছে, সাদিয়ার আয়কর নথিতে এখন সম্পদ এক কোটি ৭৮ লাখ টাকা। কিন্তু তিনি বর্তমানে কর্মহীন। ফলে প্রশ্ন উঠছে—তার আয়-ব্যয়ের সঙ্গে ১২ কোটি টাকায় ফ্ল্যাট কেনার হিসাব কীভাবে মেলে?
কোনো পৈতৃক সম্পদ বা পারিবারিক আর্থিক সহায়তার প্রমাণও তদন্তকারীরা পাননি। নাম-বেনামে বিস্তৃত সম্পদ: কর গোয়েন্দাদের প্রাথমিক অনুসন্ধান
কর গোয়েন্দা ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তের প্রাথমিক ধাপেই মারুফের নামে-বেনামে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের তথ্য মিলেছে।
তাদের হিসাবে-
পূর্বাচলের রূপগঞ্জ অঞ্চলে ১৫ কাঠা জমি,উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে তিন কাঠার প্লট,নিকুঞ্জে তিন কাঠার আরেকটি প্লট,স্ত্রী ও স্বামীর নামে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি, ব্যাংক হিসাবগুলোতে কোটি টাকার জমা,গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে বিপুল জমি ও ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ
এনবিআরের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে দায়িত্বে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কর-ফাঁকির বড় বড় মামলাকে অস্বচ্ছ উপায়ে সমাধা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার করে অতিরিক্ত আয়ের একটি ক্লাসিক উদাহরণ।
কর গোয়েন্দা ইউনিটের কমিশনার বলেন: হ্যাঁ, অতিরিক্ত কর কমিশনার শাহ মোহাম্মদ মারুফের বিষয়ে তদন্ত চলছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেব।
তিনি এ ছাড়া আর কিছু বলতে অপারগতা জানান।
তবে কর প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে এখন যে গুঞ্জন—তা থামছে না।
এনবিআরের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, গোপালগঞ্জ বাড়ি হওয়ার দাপটে এবং আগের সরকারের শক্তিধর অংশে ঘনিষ্ঠতার কারণে মারুফ দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
অভিযোগ— কর অঞ্চল–৪, কর অঞ্চল–৫, কর অঞ্চল–১২, এবং নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের মতো সংবেদনশীল ও লাভজনক জায়গায় তিনি পোস্টিং পান।
একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, করদাতাদের কর ফাঁকি দিতে সহায়তার বিনিময়ে তিনি যে আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিপুল অর্থ লেনদেনের চিত্র উঠে আসতে পারে।
ভালোদের জন্য কঠিন, অসৎদের জন্য স্বর্গ—বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতিবাজ কর কর্মকর্তারা বড় ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী, করদাতাদের কর ফাঁকি দিতে সহায়তা করেন এবং নিজেরাও আয়কর ফাইলে জালিয়াতি করে অবৈধ আয়কে বৈধ করার চেষ্টা করেন।
তিনি আরও বলেন—
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিভাগীয় শাস্তির পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ড. ইফতেখারুজ্জামান কর প্রশাসনের বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, যারা ন্যায় ও সততার সঙ্গে কর দিতে চান তাদের জন্য অফিসে প্রবেশ করাই কঠিন। আর যারা অসৎভাবে কর ফাঁকি দেয় তাদের জন্য বিভিন্ন পথ খোলা থাকে। বর্তমান আলোচিত ঘটনাটিও সেই চিত্রই দেখাচ্ছে।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে— মারুফের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে, দুই ধরনের মনোভাব, তৈরি হয়েছে। একদল কর্মকর্তা মনে করছেন—এই তদন্ত কর প্রশাসনে সুশাসন ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ। অন্যদল এটিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চাপ হিসেবে দেখছেন।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন:
তদন্ত চলছে, কিন্তু তিনি এখনও গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে দায়িত্বে রয়েছেন—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কর ফাঁকি মামলার এক করদাতার বর্ণনা, এক ব্যবসায়ী, যিনি কর অঞ্চল–৫-এ মারুফের দায়িত্বকালে কর-সংক্রান্ত একটি মামলার সম্মুখীন হয়েছিলেন,
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,সিস্টেমের মধ্যে এক ধরনের অস্বচ্ছতা আছে।
কিছু কর্মকর্তা ইচ্ছে করলে আপনার ফাইল দ্রুত নিরসন করে দেবে, আবার ইচ্ছে করলে বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখবে।
তিনি অনুযোগের সুরে আরও বলেন—
দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার ইঙ্গিত ছাড়া অনেক সময় কিছুই এগোয় না।
যদিও এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে এটি কর প্রশাসনের চেইন অব কমান্ডে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির ইঙ্গিত বহন করে।
বারিধারার অ্যাপার্টমেন্টের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, ব্যয়ের আরেক বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ফ্ল্যাটে ইউরোপীয় স্টাইলের বাথরুম ফিটিংস, মারকেটেড কাঠের আসবাব, বিদেশি ঝাড়বাতি, বিশেষায়িত অভ্যন্তরীণ নকশা, স্থাপন করা হয়েছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বলেন, ইন্টেরিয়র ডিজাইনে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে বলে শোনা যায়।
এ সজ্জা ও নির্মাণ ব্যয় বৈধ আয়ের সঙ্গে বেমানান—এমন মন্তব্য করছেন তদন্তকারীরা।
ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের প্যাটার্নে অসংগতির ইঙ্গিত
কর গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, তারা মারুফের ব্যাংক হিসাবগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমা–উত্তোলনের তথ্য পেয়েছেন। একাধিক হিসাবের লেনদেন-তথ্য এখন বিশ্লেষণাধীন।
এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি চাকরি ছাড়া বড় কোনো আয়ের উৎস নেই। তাই এই লেনদেনগুলো কীভাবে এসেছে—সেটাই অনুসন্ধানের মূল বিষয়। ভাই-বোনের নামে সম্পদ কেনা—সন্দেহের আরেক স্তর, সূত্র জানায়, মারুফের বোনের নামে নিকুঞ্জে তিন কাঠার একটি প্লট কেনা হয়েছে। তবে এই জমির অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি।
তদন্তকারীরা বলছেন—
নাম-বেনামে সম্পদ লুকানো দুর্নীতির প্রচলিত কৌশল। এখানে সেই সন্দেহের জায়গা তৈরি হচ্ছে।
আইনের দৃষ্টিতে সম্ভাব্য অপরাধ
কর আইন ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে নিম্নোক্ত অপরাধের আওতায় পড়তে পারে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি লেনদেন গোপন করা, কর ফাঁকিতে সহায়তা, আয়কর রিটার্নে ভুল তথ্য দেওয়া
এক আইন বিশেষজ্ঞ জানান:
প্রাথমিক অনুসন্ধানে অসামঞ্জস্য ধরা পড়লে সরকারিভাবে এটি ফৌজদারি মামলার দিকে যেতে পারে।
দুদকের ভূমিকা: সামনে কী ঘটতে পারে?
একাধিক সূত্র বলছে, কর গোয়েন্দা ইউনিট প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিলে দুদক পরবর্তী ধাপে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করতে পারে।
তবে দুদকের ভেতরে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা না হওয়ার উদাহরণ থাকায় এবারও কি কোনো চাপ তৈরি হবে—এই প্রশ্ন উঠছে।
মারুফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা
সারাদিন তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বারিধারার বাসায় গিয়েও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তার বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
এক সাবেক কর কমিশনার বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা চাকরি করে এত সম্পদের মালিক হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তদন্তে অবৈধ সম্পদের প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন—
কর প্রশাসন যদি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তাহলে রাষ্ট্রের রাজস্ব কাঠামোই ঝুঁকিতে পড়ে।
কর প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ: পরিসংখ্যান যা বলছে, বাংলাদেশের,কর-জিডিপি,অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্নের মধ্যে। তথ্য বলছে—
দেশে করদাতা প্রায় ৮০ লাখ
কিন্তু নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় মাত্র ৩৫-৪০ লাখ
কর ফাঁকি বছরে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো (টিআইবির হিসাব) বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার দুর্নীতি পুরো ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। সামগ্রিক মূল্যায়ন, কেন এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ
শাহ মোহাম্মদ মারুফের বিরুদ্ধে তদন্ত শুধুই একটি কর্মকর্তা-নির্ভর ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের কর প্রশাসনে সুশাসন, দায়বদ্ধতা এবং দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি–সবকিছুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে উঠে আসে -সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি-ফ্ল্যাট–জমি–ব্যাংক হিসাবের অসামঞ্জস্য-নাম-বেনামে সম্পদ ক্রয়-প্রভাবশালী স্থানে ধারাবাহিক পোস্টিং-ভেতরের নেটওয়ার্কিং ও রাজনৈতিক সংযোগ-তদন্তে বিলম্ব বা দায়মুক্তির আশঙ্কা
অনেকেই বলছেন, এই তদন্ত বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সামনে যেটি গুরুত্বপূর্ণ
কর গোয়েন্দা বিভাগ তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলে পুরো বিষয়টি নতুন দিকে মোড় নিতে পারে।
এই মুহূর্তে যে প্রশ্নগুলো সামনে—
অভিযোগ কি প্রমাণ হবে?
দুদক কি আনুষ্ঠানিক তদন্তে নামবে?
অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের উৎস কী?
একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে?
তদন্তের মাধ্যমে কর প্রশাসনে আস্থা ফিরবে কি?
বাংলাদেশের কর প্রশাসনের ভবিষ্যৎ সুশাসন অনেকটাই নির্ভর করছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কীভাবে সামনে আসে তার ওপর।