নাটোরের ‘হ্যাকার সিন্ডিকেট’: পরিচয় বদলে ব্ল্যাকমেইল — দেশজুড়ে সক্রিয় এক গোপন চক্র।
নাটোর প্রতিনিধি :
নাটোর জেলার একটি সংগঠিত হ্যাকার চক্র এখনো সারা দেশে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই চক্র নিজেদের কখনো পুলিশ কর্মকর্তা, কখনো সেনাবাহিনীর সদস্য, আবার কখনো সংবাদকর্মী পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও ব্যক্তিগত তথ্য কাজে লাগিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই চক্রটি গত কয়েক বছর ধরে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ও মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। তারা ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে পরে তা ফাঁসের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের কৌশল নিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ বলছে, নাটোরের লালপুর, বড়াইগ্রাম ও সদর এলাকার কিছু যুবকই এই চক্রের মূল হোতা। তারা প্রথমে ভুয়া পরিচয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। পরে নিজেদের পুলিশ, র্যাব, সেনা কর্মকর্তা বা সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করে।
একজন ভুক্তভোগী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, একজন লোক নিজেকে সেনা কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে আমার ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।
অন্য এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি একজনকে সাংবাদিক মনে করে বিশ্বাস করেছিলেন। পরে জানা যায়, তার পরিচয় ভুয়া। তিনি তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন।
তথ্য বলছে, এই হ্যাকার চক্রের কার্যক্রম শুধু নাটোরেই সীমাবদ্ধ নয়— চক্রটি রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, ঢাকা ও চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। অনলাইন লেনদেন ও ইলেকট্রনিক যোগাযোগ আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে তারা সহজে একাধিক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে।
সাইবার সিকিউরিটি ইউনিটের একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ছয় মাসে এ ধরনের প্রায় ১,২০০টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে নাটোর অঞ্চলকে “উদীয়মান হটস্পট” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানান, এই চক্রগুলো খুব সংগঠিতভাবে কাজ করে। তারা প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং সহজে ধরা না পড়তে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভুয়া আইপি ও ভিপিএন ব্যবহার করে।
প্রশ্ন উঠছে— দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি?
সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট সাইবার গোয়েন্দা অভিযান, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছায়া পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় এই চক্রের সদস্যরা অনেক সময় ধরা পড়লেও পার পেয়ে যায়।
একাধিক গোপন সূত্র জানায়, চক্রটি মূলত তিন স্তরে কাজ করে— “ট্র্যাপ টিম” – যারা ভুয়া আইডি খুলে টার্গেট নির্ধারণ করে।
“অপারেশন টিম” – যারা ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি হাতিয়ে নেয়।
“কালেকশন টিম” – যারা ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে।
এছাড়া তারা বিকাশ, নগদ, ক্রিপ্টো ওয়ালেট এবং অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
“এই চক্রের সদস্যরা একবার টাকা পেলে বারবার নতুনভাবে ব্ল্যাকমেইল করে। অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে অভিযোগ করেন না। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
ডিজিটাল সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ মনে করেন, এই ধরনের চক্র মানুষের সামাজিক লজ্জা ও ভয়কেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
“যাদের ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য তারা হাতিয়ে নেয়, তাদের অনেকেই ভয় ও মানসম্মানের কারণে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চান না। এই সুযোগে চক্রটি আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে,”— বলেন তানভীর আহমেদ।
তিনি আরও বলেন, এমন অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত, লোকাল ও জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত অভিযান, এবং ডিজিটাল সচেতনতা কর্মসূচি নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এটি একটি বড় সাইবার নিরাপত্তা হুমকিতে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী— ২০২4 সালে সাইবার প্রতারণার মামলা ছিল ৩,৫০০টি, ২০২5 সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫,৮০০টি, ভুয়া আইডি ও ব্ল্যাকমেইল সংশ্লিষ্ট মামলাই এর মধ্যে প্রায় ৪২%
ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই চক্রকে আইনের আওতায় না আনা গেলে আরও বহু মানুষ ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদে পড়বে। তারা প্রশাসনের কাছে দাবি তুলেছেন—
দ্রুত গ্রেপ্তার অভিযান,
জনসচেতনতা বৃদ্ধি,
অনলাইন লেনদেন ও তথ্য সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ।
একজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বলেন,
এই চক্র আমার ব্যবসায়িক তথ্য ফাঁস করার হুমকি দিয়ে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। মামলা করেছি, কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নাটোরকেন্দ্রিক এই হ্যাকার সিন্ডিকেট কেবল একটি জেলা নয়— এটি বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
সরকারি সংস্থার সমন্বিত অভিযান, সাইবার আইন বাস্তবায়ন, প্রভাবশালীদের ছায়া থেকে বের হয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই চক্র ভাঙা কঠিন হবে।