বিশেষ প্রতিনিধি |
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে যখন দেশে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তখন রাষ্ট্রচিন্তক ও কবি ফরহাদ মজহারের বক্তব্যে ফের আলোচনার ঝড় উঠেছে। তিনি দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছাত্র-তরুণরা রাজনৈতিকভাবে ভুল করেছে, আর সেই কারণেই দেশে একটি নির্বাচনবাদী বয়ান তৈরি হয়েছে—যা, তার ভাষায়, লুটেরা-মাফিয়াদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের যুক্তি তৈরি করছে।
‘ক্ষমতা ভারতের হাতে চলে যাবে—ফরহাদ মজহারের আশঙ্কা
শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ফরহাদ মজহার বলেন, এই নির্বাচনবাদীরা বলছে—একটি বৈধ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন দরকার। কিন্তু নির্বাচনের পরে ক্ষমতা থাকবে না তরুণদের হাতে, থাকবে ভারতের কাছে। এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় বইছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ মন্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ভারতের প্রভাব নিয়ে এই ধরনের বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে সংবেদনশীল ইঙ্গিত বহন করে। সংবিধান ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার—নতুন প্রশ্নের মুখে রাষ্ট্রচিন্তা-
ফরহাদ মজহার বলেন,
সংবিধান তো কলোনিয়াল লোকজনই করেছে—আমি আপনাকে শাসন করবো, তাই আমি আইন বানাবো। জনগণ নিজেরাই যখন শাসনের পদ্ধতি আবিষ্কার করে, সেটাই গঠনতন্ত্র।
তথ্য বলছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশের সংবিধানকে তখনকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব,জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই বক্তব্য কি সংবিধান সংস্কারের দাবি জোরালো করছে, নাকি রাষ্ট্রের মৌল কাঠামো নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে? ভুল স্বীকার করা দরকার—আন্দোলনের ভিত নড়বড়ে হওয়ার ইঙ্গিত
ফরহাদ মজহার বলেন,
পাঁচ তারিখে আমরা যেভাবে সরকার গঠন করেছি, তাতে ভুল ছিল। সে ভুলের দায় নিতে হবে সকলকে। তিনি অভিযোগ করেন, যারা আন্দোলনে ছিল না, তারাও হঠাৎ নেতৃত্বের অংশ হয়ে যায়—যা গণআন্দোলনের শক্তি বিভক্ত করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বক্তব্য আন্দোলন-পরবর্তী নেতৃত্ব কাঠামোর দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে। গণ সার্বভৌমত্ব বনাম রাষ্ট্র সার্বভৌমত্ব—নতুন রাজনৈতিক দর্শনের ইঙ্গিত
ফরহাদ মজহার বলেন,
গণ সার্বভৌমত্ব মানে জনগণের হাতে ক্ষমতা। রাষ্ট্রের ক্ষমতা মানে আমলা, সেনাবাহিনী ও পুলিশের ক্ষমতা। তিনি যুক্তি দেন, জনগণ যদি সত্যিকারের ক্ষমতার মালিক হতে চায়, তাহলে রাষ্ট্রকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে—ঢাকাকে ভেঙে প্রতিটি জেলাকে স্বাধীন প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।
তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৯০ শতাংশ সরকারি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ঢাকায়, যা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পথে অন্যতম বাধা বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ফরহাদ মজহারের বক্তব্য রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন গণতান্ত্রিক মডেল নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এটি বাস্তবায়নে সাংবিধানিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
আমরা মূর্খ জাতি’—তরুণ প্রজন্মের প্রতি হতাশা
ফরহাদ মজহার তরুণদের সমালোচনা করে বলেন, আমরা মূর্খ জাতি। আমাদের তরুণরা এখনো পর্যন্ত একটি পত্রিকা বের করতে পারেনি—কি বিপ্লব করবে? এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ একে কঠোর আত্মসমালোচনা,বলেছেন, কেউ বা দেখছেন নতুন প্রজন্মের প্রতি অবমূল্যায়ন হিসেবে।
সূত্র জানায়, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে অনলাইন আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন, যেখানে তরুণদের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ভয়, ও সামাজিক বিভাজন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
অবৈধ সরকার’ মন্তব্যে নতুন বিতর্ক
ফরহাদ মজহার বলেন,
আমরা এখন একটি অবৈধ সরকারের উপর বসে আছি। এই সরকারের কোনো এখতিয়ার নেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করার। এই বক্তব্য নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
একজন সাবেক আমলা বলেন, অবৈধ বলাটা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক হলেও, এতে সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা মন্তব্য করেন, দেশের সংবিধান বহাল আছে। তাই সরকার অবৈধ বলার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্র তামাশা করতে পারে না’—সংবিধানিক বার্তা
ফরহাদ মজহার বলেন,
স্টেট তামাশা করার জন্য নয়—রাষ্ট্র তামাশা করতে পারে না। তার মতে, সংবিধান রক্ষা করতে হলে তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে, আর পরিবর্তন করতে হলে নতুন গঠনতন্ত্র প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার সানজিদা তাসনিম বলেন, তার বক্তব্য সংবিধানিক রূপান্তর ও জনমতের বৈধতা প্রশ্নে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
প্রধান অতিথি আসিফ মাহমুদ: ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়ে কেউ কিছু জানায়নি
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন,গণঅভ্যুত্থানের পরে স্থিতিশীলতার জন্য একটি সরকার গঠন প্রয়োজন ছিল। আমরা তখন আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তিনি আরও বলেন,
এখন বলা হচ্ছে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হচ্ছে। কিন্তু কেউ কি এর কোনো ধারণা বা প্রস্তাব দিয়েছেন? আমি তা জানতে চাই।
তথ্য বলছে, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ বা New Political Settlement নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নথি বা রূপরেখা প্রকাশ পায়নি।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে গণ সার্বভৌমত্ব ও বৈধতার প্রশ্ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ফরহাদ মজহারের বক্তব্যে একদিকে আছে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ ও নতুন রাষ্ট্রচিন্তার ইঙ্গিত, অন্যদিকে আছে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি হতাশা ও সংশয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ বলেন,
তিনি যা বলেছেন, তা সরাসরি বর্তমান ক্ষমতার বৈধতা ও রাষ্ট্র কাঠামোর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর বিকল্প কাঠামো কেমন হবে—তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
অন্যদিকে কিছু গবেষক মনে করেন, ফরহাদ মজহারের বক্তব্যে জনগণকেন্দ্রিক বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার বীজ আছে—যা আগামী দিনগুলোর আলোচনাকে প্রভাবিত করবে। ফরহাদ মজহারের বক্তব্য শুধু একটি আলোচনা সভার অংশ নয়—এটি রাষ্ট্র, সংবিধান, সার্বভৌমত্ব ও তরুণদের ভূমিকা নিয়ে এক গভীর দার্শনিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা করেছে।
প্রশ্ন উঠছে—এই আলোচনাগুলো কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের নতুন পথ তৈরি করবে, নাকি পুরনো বিভাজনকেই আরও গভীর করবে?