নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকে গভীর আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের ভেতরকার একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মজিবুর রহমানের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, ঘনঘন বদলি এবং অনিয়মের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
২০২৪ অর্থবছরে জনতা ব্যাংক ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে—প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, চলতি বছরে লোকসান ৪ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পুনঃতফসিলের প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ায় শ্রেণিকৃত ঋণ কমছে না, বরং বাড়ছে।
ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের অভিযোগ—বদলি নিয়ে অস্বচ্ছতা, ঘুষ লেনদেন এবং কর্মকর্তা বদলিতে পক্ষপাতিত্ব দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। ব্যাংকপাড়ায় গুঞ্জন রয়েছে—এমডি পদ পেতে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছিল। প্রথম আলো এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ওরিয়ান ফার্মার একটি প্রকল্পের ফায়ার ইনসুরেন্স নিয়ে চাপ প্রয়োগের অভিযোগও ওঠে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইনসুরেন্স নির্দিষ্ট একটি কোম্পানিকে দিতে বাধ্য করা হয়। এতে কমিশন বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন আছে। গ্রাহকপক্ষ বলছে, “চাপের মুখে ডেবিট চিঠি দিতে হয়েছে।
এ বিষয়ে এমডির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকের শাখাগুলোতে ঘনঘন রদবদল এখন নিয়মিত বিষয়। কর্মকর্তারা বলেন, দক্ষতা নয়—ঘনিষ্ঠতা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে পোস্টিং নির্ধারণ করছে। এতে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বাদ পড়ছেন।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “ব্যাংকিংয়ে স্থিতিশীলতা খুব জরুরি। কিন্তু হঠাৎ বদলিতে ব্রাঞ্চ পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, সাক্ষাৎকার এবং প্রচারণায় এমডির উপস্থিতি বেড়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, এসব প্রচারণায় ব্যাংকের অর্থ খরচ হচ্ছে, কিন্তু গ্রাহকসেবায় তেমন উন্নতি নেই।
জনতা ব্যাংক দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরকারি ব্যাংক। শিল্পায়নের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক আর্থিক চাপ, নীতি বাস্তবায়নের জটিলতা এবং ভেতরের অস্থিরতা ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, “রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ছাড়া টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। জনতা ব্যাংক এখন যে অবস্থায় রয়েছে, তা নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।”
মজিবুর রহমান ১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পান।