নিজস্ব প্রতিবেদক
ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন মামলা ‘প্রভাবিত’ করতে সিমিন রহমান গণভবনে একাধিক দফা বৈঠক করেন এবং পরে তিন উৎসে মোট ১০০ কোটি টাকা প্রদান করেন।
তবে এসব অভিযোগ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ৫ নভেম্বর কমিশনের নিয়মিত বৈঠকে অভিযোগটির অনুসন্ধান অনুমোদন করা হয়। দুদকের উপপরিচালক এ কে এম মাহবুবুর রহমানকে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিশনের বিধিমালা অনুযায়ী ৪৫ দিনের মধ্যে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় বাড়তে পারে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের মার্চে গণভবনে বৈঠকের পর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে সিমিন রহমানের অ্যাকাউন্ট থেকে দুটি চেক ইস্যু হয়—২৫ কোটি টাকা ‘সূচনা ফাউন্ডেশন’-এ এবং ৫০ কোটি টাকা ‘শেখ মুজিব জাদুঘর ট্রাস্ট’-এ। আরও ২৫ কোটি টাকা নগদে প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে। দুদক সূত্র বলছে, এসব লেনদেন কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে হয়েছে—সেটি এখন অনুসন্ধানের প্রধান বিষয়।
লতিফুর রহমান মৃত্যুর পর ট্রান্সকম গ্রুপের সম্পদ ও শেয়ার নিয়ে পারিবারিক বিরোধ তীব্র হয়। তাঁর মেয়ে শাযরেহ হক বড় বোন সিমিন রহমানসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করেন।
অভিযোগে বলা হয়—
পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও এফডিআরে থাকা প্রায় ১০০ কোটি টাকা যথাযথ বণ্টন না করে সিমিন রহমান ও তাঁর মা শাহনাজ রহমান নিজেদের অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেন।
২০২০ সালের আগস্টে ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকসের শেয়ার কেনার কথা বলে সিমিন রহমান ৬০ কোটি টাকা নেন।
শেয়ার মালিকানা নিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে দলিল তৈরি এবং উত্তরাধিকারীদের অজ্ঞাতে শেয়ার স্থানান্তরের অভিযোগও তোলা হয়েছে। এ ঘটনায় করপোরেট অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক ফখরুজ্জামান ভূঁইয়া, প্রাক্তন কোম্পানি সেক্রেটারি মো. কামরুল হাসানসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।
গত বছরের মার্চে ঢাকার গুলশান থানায় দায়ের করা আরেক মামলায় অভিযোগ করা হয়, শাযরেহ হকের ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের মৃত্যু ‘স্বাভাবিক ছিল না’ এবং সম্পত্তি–কেন্দ্রিক বিরোধের মধ্যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
মামলায় সিমিন রহমানসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে মামলার নথিতে ‘হত্যার প্রমাণ’ প্রসঙ্গে তদন্ত এখনও চলমান।
আরেকটি মামলায় বলা হয়, লতিফুর রহমান মৃত্যুর পর গ্রুপের শেয়ার বণ্টন পুনর্গঠনের জন্য ‘ডিড অব সেটলমেন্ট’ নামে একটি সমঝোতা দলিল তৈরি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দলিলটিতে মৃত লতিফুর রহমান, নন্দিত আরশাদ এবং শাযরেহ হকের দুই সন্তানের স্বাক্ষর জাল করা হয়।
এই মামলায় সিমিন রহমান, তাঁর মা শাহনাজ রহমান এবং ছেলে যারাইফ আয়াত হোসেনসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযোগগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক। প্রথম পর্যায়ে ব্যাংক লেনদেন, ট্রাস্ট–অ্যাকাউন্ট, শেয়ার ট্রান্সফার এবং আদালতের নথি তুলে দেখা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা হতে পারে।