অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 10, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি: সেবার আড়ালে দুর্নীতির জাল

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি: সেবার আড়ালে দুর্নীতির জাল, মব সন্ত্রাসে আতঙ্ক বিদেশি ডেলিগেটদের


 স্টাফ রিপোর্টার 

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি—যা একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান—দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা প্রদানের অন্যতম শীর্ষ সংস্থা হিসেবে। কিন্তু গত এক দশকে সংস্থাটির অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক প্রভাবের এমন এক জাল, যা আজ এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

“তথ্য বলছে”, সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে একাধিক কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকা লোপাট, নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য ও টেন্ডার কারসাজিতে জড়িয়ে পড়েছেন। এমনকি নিজেদের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে তারা বহিরাগত রাজনৈতিক কর্মী ও সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে ‘মব সন্ত্রাস’ পর্যন্ত চালাচ্ছেন—যা আন্তর্জাতিক সংস্থার ইতিহাসে নজিরবিহীন।

২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর, বুধবার দুপুর। ঢাকার তেজগাঁওয়ে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর। দুপুর আড়াইটার দিকে হঠাৎ কয়েক ডজন বহিরাগত লোক ভবনের সামনে জড়ো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে তারা প্রবেশের জন্য কারণ দেখাতে ব্যর্থ হলেও কিছুক্ষণ পরই এনসিপি (ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি) নেতা ও সংস্থার উপ-পরিচালক মুনতাসির মাহমুদ নিজে এসে নিরাপত্তা কর্মীদের হুমকি দিয়ে মবকে ভবনের ভিতরে ঢুকিয়ে দেন।

তারা সরাসরি চেয়ারম্যান সচিবালয়, মহাসচিবের দপ্তরসহ সংস্থার সংবেদনশীল দপ্তরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বিদেশি ডেলিগেট ও কর্মীদের মধ্যে।
“প্রশ্ন উঠছে”—একটি আন্তর্জাতিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এই ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো?

একজন বিদেশি ডেলিগেট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“এমন নিরাপত্তাহীন পরিবেশে আমরা কখনো কাজ করিনি। আমাদের মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন—এখানে যদি মব ঢুকতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু ঘটলে নিরাপত্তা কে দেবে?”

হাতিরঝিল থানা পুলিশকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়। তবে ততক্ষণে মব সৃষ্টিকারীরা ভবনের ভেতরে প্রবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

“সূত্র জানায়”, এ ঘটনার পেছনে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইমাম জাফর শিকদার—যিনি সংস্থার সাবেক পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগে আলোচিত ছিলেন। তিনি অতীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে টেন্ডারবাজি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে একাধিক তদন্তে উঠে এসেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যেই তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, ইমাম জাফর শিকদারকে সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চট্টগ্রাম জেমিসন হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে। কিন্তু এই বদলির পর থেকেই তিনি সংস্থার ভেতরে উত্তেজনা সৃষ্টির কৌশল নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

একজন কর্মকর্তা বলেন,

“ইমাম জাফর শিকদার দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছেন। তিনি এখন বাইরে থেকেও প্রভাব খাটাচ্ছেন।

তথ্য বলছে, ইমাম জাফরের সহযোগী মুনতাসির মাহমুদ এনসিপি ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি কোনো প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই এক বছরের চুক্তিতে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে উপ-পরিচালক পদে যোগ দেন—যেখানে তার মাসিক বেতন ৮০ হাজার টাকা। সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে তিনি এই নিয়োগ পান।

কর্মচারীদের একাধিক অভিযোগ অনুযায়ী, মুনতাসির নিয়মিত অফিসে উপস্থিত হন না, বরং বহিরাগত লোকজন নিয়ে অফিসে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন। তার কর্মকাণ্ড সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে। তিনি প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন—তিনি তেজগাঁও এলাকা থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবেন।

“প্রশ্ন উঠছে”—একটি অরাজনৈতিক মানবিক প্রতিষ্ঠানে বসে রাজনৈতিক কার্যক্রম ও মব সংগঠনের অধিকার কিভাবে কেউ পায়?

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদর দপ্তরে প্রতিদিন আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট মুভমেন্টের প্রায় ২৫ জন বিদেশি ডেলিগেট অফিস করেন। ঘটনাটির দিন হঠাৎ করে মব প্রবেশের ঘটনায় তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

একজন ইউরোপীয় ডেলিগেট বলেন,

“বাংলাদেশের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে আমরা বহু বছর ধরে কাজ করছি। কিন্তু এই ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা বা মব সন্ত্রাস আগে কখনো দেখিনি। এটি শুধু আমাদের নিরাপত্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং পুরো সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধাক্কা দিয়েছে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ১৯৭৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস মুভমেন্টের সদস্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন সময় মানবিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এই সংস্থা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সেবামূলক সংস্থাগুলো সাধারণত রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করে। অথচ বাংলাদেশের রেড ক্রিসেন্টে এর উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা ও দুর্নীতি-বিষয়ক বিশ্লেষক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন,

“এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে যদি রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির জাল ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আস্থা নষ্ট হয়। এর প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও।

তথ্য বলছে, গত এক দশকে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে অন্তত ৩২টি পদে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে লোক নিয়োগ হয়েছে—যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা হয়নি। নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠজন।

একজন কর্মকর্তা বলেন,

“এখানে চাকরি পেতে হলে যোগ্যতার চেয়ে বড় ছিল ‘যোগাযোগ’। অনেকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে পদ কিনেছেন—এটা অফিসে সবারই জানা কথা।”

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, মব সন্ত্রাসের ঘটনাটি আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ফেডারেশনের নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি ডেলিগেটরা নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও ‘ব্যাখ্যা’ চাওয়া হতে পারে।

একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“এই ধরনের ঘটনা যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যাহত হতে পারে। এটি দেশের ভাবমূর্তির জন্যও একটি নেতিবাচক সংকেত।”

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই ঘটনায় নজর দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় তদন্তের জন্য ইতোমধ্যে দুদক কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত বড় কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

“প্রশ্ন উঠছে”—একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর পদক্ষেপে এত বিলম্ব কেন?

সংস্থার এক নারী কর্মী বলেন,

“আমরা প্রতিদিন ভয়ে কাজ করি। কে কখন কাকে নিয়ে অফিসে আসবে—এই আতঙ্কে থাকি। বিদেশিরাও এখন অনেকটা দূরত্ব বজায় রাখছে।”

আরেকজন কর্মকর্তা বলেন,

“এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এখন যেন মানবিক সেবা নয়, বরং রাজনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই। 

অভ্যন্তরীণ কর্মচারীদের একটি অংশ লিখিতভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যানের কাছে আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। তারা মব সন্ত্রাসে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সংস্কার দাবি করেছেন।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এক সময় ছিল আস্থার প্রতীক। কিন্তু “তথ্য বলছে”—দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগ বাণিজ্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আজ এই প্রতিষ্ঠানকে একটি ‘সংকটের মুখে’ ঠেলে দিয়েছে। মব সন্ত্রাসের মতো ঘটনা শুধু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতেও আঘাত হানছে।

“সূত্র জানায়”, যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে এই প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক তহবিল, সহযোগিতা এবং বিশ্বাস—সব ক্ষেত্রেই কঠিন সংকটে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মানবিক সেবার ক্ষেত্র রাজনীতি থেকে মুক্ত না হলে শুধু রেড ক্রিসেন্ট নয়, পুরো মানবিক খাতই সংকটে পড়বে।”


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে ভূমি কর্মকর্তা বরখাস্ত

1

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের টেন্ডারবাজি :

2

গণপূর্তে আবারও বাধ্যতামূলক অবসর: প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক সিদ্ধ

3

ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার নারী সদস্যর

4

প্রশিক্ষণ শেষের দিনেই চাকরিচ্যুত ৩ ম্যাজিস্ট্রেট

5

আখাউড়ায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন:

6

অতীতের রাষ্ট্রপরিচালকেরা দুর্নীতি করে আঙুল ফুলে বটগাছ হয়েছেন

7

জগন্নাথপুর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র হতে চান গীতিকার শফিক শাহ

8

রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে অনুসন্ধান: দুদক নোটিশ, আদালতের

9

জুড়ীতে মৎস্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে তো

10

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডির বিরুদ্ধে ৬৭৮ কোটি টাকার মানি লন্ডার

11

ফেনীর ছাগলনাইয়ায় পূজামণ্ডপে বিজিবি মোতায়েন ও নিরাপত্তা জো

12

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০ শতাংশ শুল্ক নিশ্চিত করা সরকারের বড় স

13

কেসিসির প্রশাসক হিসেবে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর দায়িত্ব গ্রহণ

14

নুরের ওপর হামলার দায় সরকারকে নিতে হবে: উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ

15

খুলনা ১২ নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের কমিটি গঠন

16

রোগীর ভীতি ‘টেস্ট-বাণিজ্য

17

সুটিয়াকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

18

রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদকে নিয়ে এআই প্রযুক্তির বিভ্রান্তিকর ছ

19

ধনবাড়ীতে গৃহবূধ’র মরদেহ উদ্ধার, স্বজনদের দাবী হত্যা!

20