জাহিদ সুমন :
ঢাকায় আবাসন খাতের ক্রেতারা এখন এক বাস্তব দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি। তারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বসবাসের জন্য কেনা অ্যাপার্টমেন্টে থাকলেও হঠাৎ করেই দেখছেন, তাদের ঘর বা পুরো ভবন খেলাপি ঋণ আদায়ের নিলামে উঠেছে।
এই নিলাম শুরু হয়েছে তখনই যখন ব্যাংক আবাসন কোম্পানির ঋণ খেলাপি হওয়ায় আদালতে মামলা করে এবং আদালত সেই মামলার রায় ব্যাংকের পক্ষে দেয়। তখনই ক্রেতারা হতবাক হয়ে জানতে পারেন যে, তাদের সম্পত্তি হারানোর ঝুঁকিতে।
প্রশ্ন উঠছে—যদি গ্রাহকরা দীর্ঘদিন ধরে অর্থ পরিশোধ করে আসছেন, ব্যাংক কেন এবং কীভাবে নিলামের পথে যেতে পারে? তথ্য বলছে, ঢাকার আবাসন খাতে এই সমস্যা কোনো সীমিত ঘটনার বিষয় নয়; বরং এটি একটি বিস্তৃত, সংগঠিত প্রতারণার চিত্র।
প্রতারণার প্রকৃতি: বন্ধকী ঋণ ও গোপনীয়তা
তথ্য বলছে, বেশ কিছু আবাসন কোম্পানি নির্মাণের আগে বা চলাকালীন সময়ে মোটা অংকের ঋণ নিয়ে তা ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখেছে। কিন্তু ক্রেতাদের এই তথ্য কখনোই জানায়নি।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব)-এর পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছরে প্রায় ৩৪০টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার সাথে গ্রাহকের প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ জড়িত।২০২১ সালে: ৫৬৯টি রিট, ৭৫০ কোটি টাকা।২০২২ সালে: ৬১৮টি রিট, ৮০০ কোটি টাকা।২০২৩ সালে: ৮১৩টি রিট, ১,০০০ কোটি টাকা ।২০২৪ সালে: ৭৫৪টি রিট, ১,০৫০ কোটি টাকা।২০২৫ (জানুয়ারি–সেপ্টেম্বর): ১,০৭৬টি রিট, ২,৫০০ কোটি টাকা।
তথ্য বলছে, এই ধারা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আদালতে দায়ের হওয়া এই রিটগুলো মূলত হাইকোর্টে নিলাম স্থগিত করতে করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের গল্প
ডা.- নাম না বলার স্বার্থে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তরার ‘ব্রাইট সাউথ’ প্রকল্পে ১,২৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। প্রায় দেড় কোটি টাকা পরিশোধের পর পরিবারের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন।
তবে এক বছর পর হঠাৎ দেখেন, ১২ ইউনিট বিশিষ্ট ছয় তলা ভবনটি নিলামে উঠেছে। আদালতের নথি বলছে, সোনালী ব্যাংক উত্তরা শাখা ব্রাইট ফিউচার হোল্ডিংয়ের ৩০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য নিলাম আদেশ দিয়েছে।
ডা.- অভিযোগ করেছেন, কোম্পানি তাকে মূল দলিল সরবরাহে দীর্ঘদিন তালবাহানা করেছে। পরে জানতে পারেন, কোম্পানির চেয়ারম্যান আখতার হোসেন সোহেল ২০১২ সালে ভবনটি বন্ধক রেখে ঋণ নেন এবং সেটি আত্মসাৎ করেছেন।
তিনি বলেন, “আমরা মহা-বেকায়দায় পড়ি। মাত্র ২০ দিন পরে নিলামের তারিখ ধার্য। আইনজীবীর পরামর্শে হাইকোর্টে রিট করি এবং একই সাথে প্রতারণার মামলা দায়ের করি। পরবর্তীতে মানবিক কারণে নিলাম স্থগিত হয়েছে। তদন্তকারীরা জানায়, একই কৌশলে মিরপুর, খিলখেত ও উত্তরা মিলিয়ে অন্তত সাতটি প্রকল্পে প্রতারণা করেছেন। ৫০টি মামলার আসামি তিনি ২১ অক্টোবর গ্রেপ্তার হয়েছেন; অভিযোগ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা আত্মসাতের।
ঝলক হাউজিংয়ের
পূর্ব রামপুরার বাসিন্দা। তিনি ও তার চারজন সহকর্মী তিতাস রোডের ঝলক হাউজিংয়ের চারটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। ঋণ খেলাপি হওয়ায় আদালতের রায় অনুযায়ী ব্যাংক নিলামে নিয়েছে ফ্ল্যাটগুলো।
বর্তমানে তিনি মাসিক ১৫,০০০ টাকা করে ভাড়া দিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে থাকছেন। জানা গেছে, আরও ১৫ জনের বেশি ক্রেতা একই কোম্পানির প্রকল্পে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
আইনি ফাঁকফোকর
রিহ্যাব সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “ক্রেতারা আইনি অন্ধকারে। সাধারণভাবে ব্যাংক বন্ধক নিলে স্থাপন করা উচিত সাইনবোর্ড, কিন্তু অভিযুক্ত কোম্পানি ও ব্যাংকের যোগসাজশে তা হয় না।
তথ্য বলছে, বিশ্বের উন্নত দেশে বন্ধকী সম্পত্তির তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ডিজিটাল ডেটাবেসে সংরক্ষিত থাকে। বাংলাদেশে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “বন্ধকী সম্পত্তিতে সাইনবোর্ড বাধ্যতামূলক, তবে তা না করা ও যথাযথ তদারকি না থাকার কারণে গ্রাহকরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
বিচারিক প্রক্রিয়া ও আদালতের ভূমিকা
সোনালী ব্যাংকের আইনজীবী ওয়ালিউর রহমান বলেন, “ব্যাংক তার খেলাপি ঋণ আদায়ে আদালতের পথে যায়। যদি কোম্পানি প্রতারণা করে, আদালত ব্যাংককে নিলামে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
তবে প্রশ্ন উঠছে—ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষা করতে কেন একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নেই? রিহ্যাবের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কামাল মাহমুদ অভিযোগ করেছেন, “সরকারের তদারকি যথেষ্ট নয়। কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রতারক কোম্পানি পার পেয়ে যায়।
সাব-রেজিস্ট্রারদের সংগঠন (বিআরএসএ)-এর কার্যনির্বাহী সদস্য বলেন, “দলিল সম্পাদনের পর তথ্য অনেক জায়গায় রেকর্ড হয়। শুধু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যাচাই যথেষ্ট নয়। সব পর্যায়ে সঠিক যাচাই না হলে ক্রেতাদের প্রতারণার শিকার হতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
জনপ্রশাসন ও রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূল কৌশল হলো— অবহেলিত তথ্য প্রকাশ: বন্ধকী সম্পত্তির তথ্য ক্রেতার কাছে গোপন রাখা। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘন: ব্যাংক ও রেজিস্ট্রেশন অফিসের পর্যবেক্ষণ যথাযথ নয়।আইনি ফাঁকফোকর: কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেস ও নজরদারি নেই।
ড. খন্দকার রাশেদুল ইসলাম বলেন, “ক্রেতারা যখন বিনিয়োগ করছেন, তখন সম্পত্তি নিরাপদ থাকবে—এটি মৌলিক অধিকার। এই ধরনের প্রতারণা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, সামাজিক ও মানসিক নিরাপত্তাও ক্ষুণ্ণ করে।
প্রশ্ন উঠছে
কেন ব্যাংক ও সরকারী সংস্থা বন্ধকী সম্পত্তির তথ্য ক্রেতার কাছে সরাসরি জানায় না? কেন আদালতের রায়ের পরও নিলামের তারিখ দ্রুত নির্ধারিত হয়, ভুক্তভোগীদের প্রস্তুতির সুযোগ ছাড়াই কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধান ও ডিজিটাল ডাটাবেস না থাকায় কি নাগরিকদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে?
পর্যবেক্ষণ অনুযায়
ঢাকার আবাসন খাতের ক্রেতারা এখন শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতার মুখোমুখি। শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করা পরিবাররা নিলাম, প্রতারণা ও আইনি জটিলতায় বাধাগ্রস্ত।
তথ্য বলছে, যদি সরকার দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়—কেন্দ্রীয় ডাটাবেস, সাইনবোর্ড বাধ্যতামূলককরণ, তদারকি ও জরিমানা—তাহলে এই ধরনের প্রতারণা আরও বৃদ্ধি পাবে।
প্রশ্ন এখন দেশের নাগরিকদের সামনে: আপনার বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ?
উত্তর খুঁজছে প্রশাসন, আদালত এবং রিয়েল এস্টেট খাত।