অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 27, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের টেন্ডারবাজি :

জাহিদ সুমন  

ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ, 
খাদ্য অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় সড়ক পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগে চরম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ উঠেছে। তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের একাংশের অভিযোগ—দরপত্র আহ্বান করা হলেও “মহাপরিচালকের ইচ্ছানুযায়ী” মনোনীত কিছু ব্যক্তি ও প্রভাবশালী ঠিকাদারকেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। তথ্য বলছে, এ প্রক্রিয়ায় গোপনে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে মহাপরিচালক হুমায়ুন : 

খাদ্য অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক মো. আবুল হাসানাত হুমায়ুন-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, বিভাগীয় পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগে ৮৫৭ জন তালিকাভুক্ত ঠিকাদারের মধ্যে মাত্র ৩০০ জনকে চূড়ান্ত করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই স্বজন, রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি অথবা ঘুষের মাধ্যমে প্রভাবশালী ঠিকাদার গোষ্ঠীর অংশ।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের : অভিযোগ—চূড়ান্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রতি ঠিকাদারের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেয়া হয়েছে।

একজন ঠিকাদার বলেন,

“আমরা নিয়ম মেনে দরপত্র জমা দিয়েছিলাম, কিন্তু শিডিউল জমা দিতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়ি। এমনকি আমাদের কাগজ গ্রহণ পর্যন্ত করা হয়নি। পরে শুনলাম, যারা উপরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে, তারাই কাজ পেয়েছে।”

শিডিউল জমা দিতে বাধা ও হয়রানির অভিযোগ : 

তথ্য বলছে, অনিয়মের এই প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে যেন নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদার ছাড়া অন্য কেউ অংশ নিতে না পারে।
সূত্র মতে, আরসি ফুড ও ডিজি ফুডের নির্দেশে একটি কথিত “ঠিকাদার সমিতি” নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করতে আগ্রহী ঠিকাদারদের ভয়ভীতি ও হয়রানি করে আসছে।

ভুক্তভোগী এক ঠিকাদার অভিযোগ করেন,

“আমরা কোনো চাঁদা দিতে রাজি হইনি। এরপর থেকেই আমাদের টেন্ডার বাতিল, কাগজে ভুল ধরা ও নানা প্রশাসনিক হয়রানি শুরু হয়।”

আরসি ফুড সুরাইয়া খাতুনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ : 

প্রশ্ন উঠছে—এই অনিয়মে খাদ্য অধিদপ্তরের আরসি ফুড সুরাইয়া খাতুনের ভূমিকা কতটা নিরপেক্ষ ছিল?
ভুক্তভোগীরা জানান, সুরাইয়া খাতুনের কাছে অনিয়মের অভিযোগ জানাতে গেলে তিনি ‘বাজে ব্যবহার’ করেন এবং বলেন,

আপনারা সমন্বয় কমিটির সঙ্গে কথা বলুন।

কিন্তু সমন্বয় কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই যে এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠ, সে অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

দুর্নীতির পুরনো ছায়া : 

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হুমায়ুনের বিরুদ্ধে এটি প্রথম অভিযোগ নয়।
তথ্য বলছে, আগের সরকার আমলে তিনি পরিবহন পুলে দায়িত্বে থাকাকালীন তেল বিক্রি, সরকারি গাড়ি ব্যবহারে অনিয়ম এবং ৩০–৩৫ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সূত্র জানায়, ঐ সময় তিনি সরকারি গাড়ির তেল বিক্রি করে দুবাইয়ে ফ্ল্যাট ও বাড়ি ক্রয় করেন।

এক সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন,

“যেসব আমলা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকেন, তারা স্থানান্তরিত হলেও প্রভাব হারান না। এই মহাপরিচালকও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।”

পচা গম আমদানির অভিযোগ : 

সম্প্রতি খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে আমদানিকৃত গমের একটি চালান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ আছে, আর্দ্রতা (Moisture Content) নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি থাকায় ওই গম গুদামজাতের উপযোগী ছিল না।
তবু সেই গম খাদ্যগুদামে তোলা হয় এবং পরবর্তীতে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় সরকারি গুদামগুলোতে পচন ধরেছে।

একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,

“আমরা পরীক্ষার রিপোর্টে ত্রুটি পাই। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ওই গম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি।”

প্রশ্ন উঠছে, “পচা গম আমদানিতে কার স্বার্থ জড়িত?

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ : 

প্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ম শুধু নৈতিক সংকটই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়।
সাবেক খাদ্য সচিব (অব.) একজন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন,
খাদ্য অধিদপ্তরের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে স্বজনপ্রীতি বা ঘুষ-দুর্নীতির সংস্কৃতি যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে। 

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন কর্মকর্তা বলেন,

“যদি সত্যিই নিয়োগে আর্থিক লেনদেন হয়, তাহলে এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি অবশ্যম্ভাবী।”

তথ্য বলছে: দুর্নীতির কাঠামোগত সমস্যা : 

খাদ্য অধিদপ্তরের আওতায় গত তিন অর্থবছরে (২০২২–২০২৫) পরিবহন ও সংরক্ষণ খাতে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার বেশি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।
সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব প্রকল্পে ২০–২৫ শতাংশ ব্যয়ের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

মহাপরিচালকের মন্তব্য পাওয়া যায়নি : 

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্বে মহাপরিচালক মো. আবুল হাসানাত হুমায়ুন-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তাই তার বক্তব্য প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

প্রশ্ন উঠছে : 

খাদ্য অধিদপ্তরের ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ?

শিডিউল জমা বাধা ও চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ কি প্রশাসনিকভাবে তদন্ত হবে?

পচা গম গ্রহণের পেছনে কারা দায়ী?

দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক ও খাদ্য মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নেবে?


বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্রীয় সংস্থা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের কণ্ঠে ক্ষোভ—“আমরা সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলাম, সিন্ডিকেটের সঙ্গে নয়। 
তথ্য বলছে, নীতিনির্ধারকরা ব্যবস্থা না নিলে দুর্নীতির এই চক্র আরো শক্তিশালী হবে।
এখন অপেক্ষা—রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সত্য উদঘাটনে কতটা সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খুলনায় সরকারি ওএমএসের আটা পাচারকালে গ্রেফতার এক

1

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত

2

ঠাকুরগাঁওয়ে ইত্যাদির শুটিংয়ে কী ঘটেছিল, জানালেন হানিফ সংকেত

3

কচুয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

4

নারায়ণগঞ্জে ২ হাজার কেজি জাটকা জব্দ করেছে কোস্টগার্ড

5

সরকারি কর্মচারীরা দাফনের জন্য পাবেন টাকা

6

অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক শক্তির পক্ষে নির্বাচন ব্যাহত করার সুযো

7

চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উম্মোচন করছে আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তি

8

১২ ফুট লম্বা কিং কোবরা উদ্ধার।

9

‘ডজি ডন ইজ ব্যাক’—নিউসোমের টুইট ঘিরে ট্রাম্পবিরোধী বিতর্ক

10

অভিযোগে ঘেরা জনতা ব্যাংকের এমডি মজিবুর রহমান

11

খুলনায় নেশার টাকা না পেয়ে পিতাকে হত্যা:

12

খুলনায় শিপইয়ার্ড সড়ক: ১২ বছরেও শেষ হয়নি কাজ

13

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নিয়ে বিভ্রান্তিকর খবর ‘ডাহা মিথ্যা’ — প্

14

কুড়িগ্রামে এনসিপি'র আহ্বায়ক কমিটি গঠন

15

৮০ কোটি টাকা কমিশন ডিসি-এসপির দপ্তরে

16

ওসিসহ ৩ পুলিশ কর্মকর্তার বদলি

17

বন্যপ্রাণী ও বন রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবক নিবন্ধন শুরু করল বন অধিদ

18

সোশ্যাল মিডিয়ায় জুয়া: তরুণ প্রজন্মের নীরব শিকার

19

সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের অর্থপাচার: দুদকের অনুসন্ধানে চাঞ্চ

20