স্টাফ রিপোর্টার
– ইসলামী ব্যাংকের ৯৬৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ঋণসহ মোট ১ হাজার ৯২ কোটি ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ডিসেম্বরে দুদক একটি মামলা দায়ের করে। মামলায় ৫৮ জনকে আসামি করা হলেও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্তত ৮ জন কর্মকর্তা দায়ী পাওয়া যায়, যারা ঋণ অনুমোদনে অবৈধভাবে সহায়তা করেছেন বা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি বলে দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলা ছিল এবং তাদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। একই সঙ্গে, দুদক তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি পাঠায়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক উল্টো করে চিঠি দেয়, যেখানে বলা হয় কোনো দায় নেই, এবং অনুসন্ধান থেকে অব্যাহতি দিতে ‘বিশেষ অনুরোধ’ জানানো হয়েছে।
এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি দুদকের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং চাপ তৈরির কৌশল। অনুসন্ধান বা তদন্তকে প্রভাবিত করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর ইসলামী ব্যাংকের চাকতাই শাখায় একটি হিসাব খোলা হয়। ৯ দিন পর, ২ ডিসেম্বর ২০২১-এ ঋণ বরাদ্দের আবেদন করা হয়।যাচাই-বাছাই ছাড়াই আবেদন হেড অফিসে পাঠানো।মাত্র ২১ দিনে ৮৯০ কোটি টাকা অনুমোদন।পরের ২১, ২২, ২৩ ও ২৬ ডিসেম্বর ঋণ ছাড় সম্পন্ন।
তথ্য বলছে, এই ঋণের ফলে সাধারণ গ্রাহকের আমানত ঝুঁকিতে পড়েছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হয়েছে।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান, ৫৮ জনকে আসামি করা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৮ কর্মকর্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া
৮ কর্মকর্তার নাম ও অবস্থান উঠে এসেছে, লেনিন আজাদ পলাশ – প্রধান কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক। মোহাম্মদ আবদুর রউফ – অতিরিক্ত পরিচালক।মো. মঞ্জুর হোসেন খান – অতিরিক্ত পরিচালক, ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ, উইং-৬।সুনির্বাণ বড়ুয়া – যুগ্ম পরিচালক, চট্টগ্রাম কার্যালয়। মো. জোবাইর হোসেন – যুগ্ম পরিচালক, চট্টগ্রাম কার্যালয়।অনিক তালুকদার – যুগ্ম পরিচালক, চট্টগ্রাম কার্যালয়।রুবেল চৌধুরী – যুগ্ম পরিচালক, চট্টগ্রাম কার্যালয়। একজন যুগ্ম পরিচালক, বর্তমানে নির্বাহী পরিচালক।
জানুয়ারি ২০২৫: দুদক চিঠি পাঠায়, কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য
দুই পক্ষের মধ্যে একাধিক চিঠি আদান-প্রদান হয়,বাংলাদেশ ব্যাংক সময় বৃদ্ধি ও তথ্য আংশিকভাবে প্রেরণ,
১৩ আগস্ট: দুদক গভর্নরের কাছে চিঠি দেয়, ৮ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথি পর্যালোচনা করার জন্য
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তিগত নথি প্রদান না করে অব্যাহতি চেয়ে ‘বিশেষ অনুরোধ’
সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিঠিতে উল্লেখ করে, “অভিযোগ বা প্রমাণ নেই; তাই অনুসন্ধান থেকে অব্যাহতি দিন।
বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি পাঠিয়ে দুদকের অনুসন্ধান প্রভাবিত করতে চাইছে। এটি বেআইনি এবং দুদক যে কোনো প্রমাণ পেলেই অনুসন্ধান চালিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারবে।সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী বলেন, দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, ২৭/১ ধারায় অবৈধ সম্পদের তদন্ত করবে দুদক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত বা নির্দেশনার কোনো বৈধতা নেই।
ড. ইফতেখারুজ্জামান, টিআইবি:
কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা দুদকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বিশেষ অনুরোধ’ সম্পূর্ণ বেআইনি।
অনুসন্ধান ব্যাহত হয়েছে ব্যক্তিগত নথি না দেয়ায়, ব্যাংক কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড প্রাতিষ্ঠানিক কাজের আওতায় আনা হলেও দোষ স্বীকার করা হয়নি,নথি ও ছক অনুযায়ী তথ্য না দিলে অনুসন্ধান সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তথ্য বলছে, এ ধরনের হস্তক্ষেপের কারণে দেশের শত কোটি টাকা লুটের ঘটনা উদ্ভূত হলে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি দুর্বল হয়।
অনুসন্ধান ও ফলাফল দেখা যায়,৫৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা,৮ কর্মকর্তার অব্যাহতি চাওয়ার চিঠি বাতিলযোগ্য
দুদকের অনুসন্ধান এখনও চলমান, আইনানুগভাবে এগোচ্ছে। আমরা দেখেছি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঋণ অনুমোদনের সময় তদারকি না করে গ্রাহকের পক্ষে সুবিধা নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছেন। এই ধরনের অনিয়ম সঠিক তদন্ত ছাড়া প্রকাশ পায় না।ভুক্তভোগীর বর্ণনা
ইসলামী ব্যাংকের চাকতাই শাখার ঋণকেলেঙ্কারি শুধু ব্যাংক ও কর্মকর্তাদের বিষয় নয়, এটি দেশীয় অর্থনীতিতে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রদর্শন করে।
দুদক অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘বিশেষ অনুরোধ’ প্রক্রিয়াটি পুরো তদন্ত প্রভাবিত করেছে, যা আইনগতভাবে অনৈতিক এবং জনগণের সম্পদের সুরক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন পরিস্থিতিতে কেবল দুদকই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারবে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা এই অনুসন্ধানকে প্রভাবিত করতে পারবে না।