অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Dec 6, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ইয়াবা পাচারে রেলওয়ে পুলিশের একাধিক সদস্যের নাম উঠেছে


স্টাফ রিপোর্টার | চট্টগ্রাম

 ইয়াবা পাচারে রেলওয়ে পুলিশের একাধিক সদস্যের নাম

 অভিযান, বদলি ও সম্পদের অনুসন্ধান—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন

চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানায় কর্মরত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ রেলওয়ে পুলিশের সদস্যদের গ্রেপ্তার, সম্পদ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তের তথ্য এসব অভিযোগকে আরও জোরালো করে তুলেছে।

তথ্য বলছে, ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে আট হাজার ইয়াবা বড়িসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের একজন চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান। তবে মামলা দায়েরের সময় তিনি যে একজন পুলিশ কর্মকর্তা—এ তথ্য এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।


এর আগে, গত ১২ অক্টোবর যশোরে পদোন্নতি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা বলে ছুটিতে গিয়ে ১০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেলা পুলিশে কর্মরত মো. মহিবুর রহমান। তাঁকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এই ঘটনাও রেলওয়ে পুলিশের ভেতরে মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে উদ্বেগ আরও গভীর করেছে।


পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বদলিকৃত চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মিলে একটি মাদক পাচার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন—এমন অভিযোগ অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে।ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার এসআই মিজানুর রহমানের সঙ্গে ওসি শহিদুল ইসলামের আর্থিক ও পেশাগত সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণও পাওয়া যায় তদন্তে। এরপর তাঁকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশ লাইনসে বদলি করা হয়।

সূত্র জানায়, তিনি কয়েক দফায় প্রায় সাত বছর চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ওসির দায়িত্বে ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে,মাদকের টাকায় চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে একটি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ, গ্রামের বাড়ি আনোয়ারায় জমি ও অন্যান্য সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে।

রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. জিল্লুর রহমান বলেন,
“অভ্যন্তরীণ তদন্তে ওসি শহিদুল ইসলামের মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ার পর তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর যাঁদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেয়েছি, তাঁদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।


চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার এসআই মো. দস্তগির হোসেনের বিরুদ্ধেও,মাদক বিক্রির টাকায় সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি চট্টগ্রামের চন্দনাইশে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং কক্সবাজারে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আবাসিক হোটেল গড়ে তুলেছেন। সূত্র জানায়, প্রথমে শ্বশুরের নামে জমি কিনে সেই হোটেল নির্মাণ করা হয়, পরে সেটি স্ত্রী সাইরিন সুলতানার নামে হস্তান্তর করা হয়।

তবে এসআই দস্তগির হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“গ্রামে একটি ছোট একতলা বাড়ি আমার বাবার করা। আবাসিক হোটেল আমার শ্বশুরের পারিবারিক সম্পদ।

আরেক এসআই আরব আলীর বিরুদ্ধেও ইয়াবা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ২৫ জুন চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর রেলস্টেশনে ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেন থেকে আসাদুজ্জামান (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করেন আরব আলী। তখন তাঁর কাছ থেকে ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার হলেও, আদালতে জমা দেওয়ার সময় সেই সংখ্যা কমে ১ হাজার ২০০ দেখানো হয়। বাকি ইয়াবা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

পরবর্তীতে আদালতে আসামি আসাদুজ্জামান নিজেই স্বীকার করেন, তাঁর কাছে ২০ হাজার ইয়াবা ছিল।
তবে আরব আলী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“আমি কোনো মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসআই মিজানুর রহমানকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের পর রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। পরে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিষয়টি জানতে পারলে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। তবেএকজন ঊর্ধ্বতন রেলওয়ে পুলিশ কর্মকর্তার অনুরোধে এজাহারে মিজানুরের পুলিশ পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে ডিবি-উত্তরের উপকমিশনার মো. হাবিবুর রহমান প্রামাণিক বলেন,
“এজাহার দেওয়ার সময় তিনি পুলিশ সদস্য কি না, তা জানা ছিল না। তদন্তে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।


সূত্র জানায়, মাদক পাচার প্রতিরোধে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রেলস্টেশনে স্ক্যানার বসানো হলেও জনবলের অভাবে সেগুলো পুরোপুরি কার্যকর করা যাচ্ছে না। ফলে সন্দেহভাজন যাত্রীদের একটি অংশই শুধু স্ক্যানিংয়ের আওতায় আসছে।

রেলের চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“সব যাত্রীকে স্ক্যান করা বাস্তবসম্মত নয়। সন্দেহভাজনদের স্ক্যান করা হয়। তারপরও মাঝেমধ্যে ট্রেন থেকে মাদক উদ্ধার হচ্ছে। স্ক্যানার পরিচালনার সঙ্গে কেউ জড়িত কি না, তা অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা হচ্ছে।

রেলওয়ে পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়,
“চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় দায়িত্বে থাকা কিছু সদস্যকে মাদক সিন্ডিকেট সহজেই ‘ম্যানেজ’ করে ফেলে। ফলে ট্রেনে মাদক পাচার রোধ পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না।

নজরদারি জোরদারে,কক্সবাজার রেলস্টেশনে একটি পূর্ণাঙ্গ রেলওয়ে থানা স্থাপনের সুপারিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।


মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে র‍্যাব-১৫–তে কর্মরত অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল হাসানসহ চার শতাধিক সদস্যকে একযোগে বদলি করা হয় (১৯–২৭ নভেম্বর)। যদিও র‍্যাব কর্তৃপক্ষ এটিকে নিয়মিত বদলি বলছে, তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই বদলি অভিযান মাদকবিরোধী গোপন তদন্তেরই ইঙ্গিত দেয়।


সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা বলেন,
“মাদকের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্য জড়িয়ে পড়লে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। প্রয়োজনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে একজন অপরাধ বিশ্লেষক বলেন,
“যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই মাদক নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে যান, তখন রাষ্ট্রের মাদকবিরোধী যুদ্ধ বড় বাধার মুখে পড়ে।


চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রুট দেশের ইয়াবা পাচারের অন্যতম ট্রানজিট হিসেবে পরিচিত। এখন একের পর এক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায়।প্রশ্ন উঠছে—এই নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত, আর কারা এর পৃষ্ঠপোষক?

একজন মাদকবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধি বলেন,
“গ্রেপ্তার আর বদলি যথেষ্ট নয়। পুরো নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কুমিল্লায় নিখোঁজ শিশুর গলায় পাথর বাঁধা ম'রদে'হ উ'দ্ধা'র

1

অসুস্থ হয়ে গভীর রাতে হাসপাতালে ভর্তি মির্জা ফখরুল

2

আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে ,স

3

বিবাহিত, ফেসবুকে প্রমাণ করার কিছু নেই : অপু বিশ্বাস

4

পাঠ্যপুস্তক ক্রয় প্রক্রিয়ার সময়সীমা হ্রাসের প্রস্তাব অনুমোদন

5

নিয়ামতপুরে যুবদল নেতার নেতৃত্বে সাংবাদিকের ওপর হামলা

6

নিলাম বনাম নাগরিক: ঢাকার আবাসন খাতে প্রতারণার ছায়া

7

ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে জামায়াত আমিরের বৈঠক

8

খুলনা-৬: এ্যাডভোকেট মোমরেজুল ইসলামের জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক

9

ডিএনএ আবিষ্কারক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন আর নেই

10

এনবিআর চেয়ারম্যান বিদেশে, আগুনে পুড়ল ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন

11

গণপূর্তের-১০-লাখ-টাকার-ভিডিও-ফাঁস:-ময়নুল-হক-ও-রায়হান-মিয়ার-ভ

12

‘লর্ড অব দ্য রিংস’ থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পর্যন্ত— মানবতার বা

13

ভূরুঙ্গামারীতে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও শিক্ষক নিয়ামুল আরিফ গ্র

14

প্রধান উপদেষ্টাকে মার্চে বেইজিং সফরে নিতে আগ্রহী চীন

15

চার দফা দাবিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গণছুটি: প্রশ্ন উঠছে, দুর

16

এনসিপি থেকে মাহিন সরকারকে বহিষ্কার

17

এআইইউবিতে চাকরি মেলা অনুষ্ঠিত

18

পঞ্চগড়ে দুদকের গণশুনানি আগামীকাল

19

বাংলাদেশ লায়ন্স ফাউন্ডেশনের এজিএম-এর প্রস্তুতি সভা অনু

20