নিজস্ব প্রতিবেদক:
বন্ড সুবিধার আড়ালে প্রতিমাসে গড়ে ৩১ কন্টেইনার কাপড় আমদানি—শুনতে স্বাভাবিক মনে হলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। তথ্য বলছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রাফায়েত ফেব্রিক্স লিমিটেড আমদানি করেছে ৪ হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন কাপড়, কিন্তু এর ৩ হাজার ৭৯৭ মেট্রিক টনের কোনো হদিস নেই। অভিযোগ উঠছে—এই বিপুল পরিমাণ কাপড় রাতের আঁধারে রাজধানীর ইসলামপুরের পাইকারি বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
প্রশ্ন উঠছে, যেখানে অনেক প্রতিষ্ঠান একটি কন্টেইনার খালাস করতেও হয়রানি–ঘুষের চক্রে জর্জরিত, সেখানে রাফায়েত গ্রুপ কীভাবে মাসে ৩০টির বেশি কন্টেইনার অনায়াসে ছাড় করল?
সাভারের বিরুলিয়া খাগানে রাফায়েত গ্রুপের ১০ তলা ভবনে চোখে পড়ে সাজানো আধুনিক মেশিনারিজ। সূত্র জানায়, প্রতিটি ফ্লোরে মেশিন থাকলেও নেই কোনো শ্রমিক, নেই কোনো উৎপাদন। কারখানা কাগজে-কলমে পুরোপুরি সচল হলেও বাস্তবে তা শুধুই ‘শো-রুম গার্মেন্টস’।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে—ইসলামপুরের জাকির, জাহাঙ্গীর শাহিন ও কাইয়ুম নামের তিনজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দালাল খুরশিদ আলম প্রতি এলসিতে ৪০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে মাত্র ১৫ লাখ টাকা দেওয়া হতো রাফায়েতকে। বাকি অর্থের বড় অংশ স্থানীয় দালাল ও কিছু অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা–এজেন্টদের ভাগে যেত।
খুরশিদের সহযোগী চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নেতা জামাল উদ্দিন বাবলু, যিনি ‘ঘুষের কন্ট্রাক্ট’ করে একের পর এক চালান খালাস করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
৩৫৮ কন্টেইনার কাপড়, কিন্তু রপ্তানির হিসাব প্রশ্নবিদ্ধ,অ্যাসাইকুডার তথ্য অনুযায়ী— মোট আমদানি: ৪৯২৭ মেট্রিক টন কাপড়। দেখানো রপ্তানি: ১১৩০ মেট্রিক টন, গরমিল: ৩৭৯৭ টন।
সূত্র বলছে, যে কাপড় আমদানি করা হয়েছে তার ধরন ও যে পোশাক রপ্তানির দাবি করা হয়েছে—দুটি সম্পূর্ণ অমিল। পলিস্টার–ভিত্তিক ফেব্রিক্সে রপ্তানির অনুমোদন থাকলেও কায়িক পরীক্ষায় দেখা গেছে কটন–মিশ্রিত পণ্য, বাচ্চাদের পোশাক, ম্যাক্সি, লেডিস সেট–এমন বহু ভিন্ন ধরনের পণ্য।
একটি চালানের ক্ষেত্রে দেখা যায়—
আমদানি: ২২,৪৮০ কেজি পলিস্টার ফেব্রিক্স (কম্বল কাপড়) বাস্তব রপ্তানি হিসেবে পাওয়া গেছে: লেডিস ম্যাক্সি, কটন–মিশ্রিত শার্ট, কিডস সেট ইত্যাদি
ফলে সন্দেহ দেখা দেয় যে মূল কাপড় বাজারে বিক্রি হয়েছে, একটি চালানেই শুল্কফাঁকির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা।
রপ্তানি তথ্য নিয়ে তদন্তে এনবিআর—সন্দেহ ‘কাগুজে রপ্তানিতে’
বন্ড কমিশনারেট ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে চিঠি দিয়েছে।
প্রশ্ন তুলেছে—রাফায়েত দেখানো ১১৩০ টন রপ্তানি আদৌ হয়েছে কি না?
চিঠিতে বলা হয়েছে—নমুনা ও রপ্তানি সম্পর্কিত দলিল যাচাই করে ‘বাস্তব রপ্তানি’ হয়েছে কি না—তা তদন্ত করতে হবে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রপ্তানি দেশ, পণ্যের ধরন ও পরিমাণ—সবখানেই অসঙ্গতি।
বন্ড রেজিস্টার নেই, ১৪৫ টন কাপড় সরাসরি ‘হাওয়া’ বন্ড রেজিস্টার সংরক্ষণ বন্ড বিধিমালার বাধ্যতামূলক অংশ। কিন্তু রাফায়েত ফেব্রিক্স কোনো রেজিস্টারই রাখে না—কারণ তাদের উদ্দেশ্য কারখানায় উৎপাদন নয়, বরং বন্ডের কাঁচামাল বাজারে বিক্রি করা।
ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট জানায়—
১৪৫ মেট্রিক টন কাপড় গোডাউনে ঢোকার কোনো রেকর্ড নেই,চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ার পর সরাসরি সড়কেই উধাও হয়েছে চালান এ ঘটনায় কমিশনারেট কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে।
রাফায়েত গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান এস ইসলাম–এরও হাওয়া ২,৩৮,৮২০ কেজি
এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশনস লিমিটেড— আমদানি করেছে: ২,৩৮,৮২০ কেজি কাপড়,গোডাউনে যায়নি এক কেজিও, খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে—মূল্য ১২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা
শুল্কফাঁকি: ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা
অন্য এক চালানে ২৪,৬০৮ কেজি কাপড়–এরও কোনো হদিস নেই।
উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজসের অভিযোগ—‘মাসিক কন্ট্রাক্ট’
বন্ড কমিশনারেটের সূত্র বলছে-প্রতিমাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষের কন্ট্রাক্টে সবকিছু চলে। ফলে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো পরিদর্শন হয় না।
একজন উচ্চপদস্থ এনবিআর কর্মকর্তা বলেন—যেখানে কোনো উৎপাদন নেই, রপ্তানি নেই—সেখানে মাসে ৩১ কন্টেইনার আমদানি কীভাবে সম্ভব? লাইসেন্স কীভাবে দেওয়া হলো—এটা বড় প্রশ্ন।
দুবাই লেনদেন—টিটি পাঠানো, জাল সেলস কন্ট্রাক্ট এবং অর্থ পাচারের শঙ্কা
অনুসন্ধান বলছে—
রাফায়েত গ্রুপ দুবাই ফ্রি–জোনে একাধিক শেল কোম্পানি খুলে রেখেছে
এসব কোম্পানি থেকে টিটি পাঠানো হয়
সেই টিটির বিপরীতে বাংলাদেশে জাল সেলস কন্ট্রাক্ট দেখিয়ে এলসি খোলা হয়
রপ্তানি না করেও কাগজে রপ্তানি দেখানো হয়, দেশে বাজারে বিক্রির টাকা আবার দুবাইতে পাচার করা হয়
সূত্র জানায়, রাফায়েতের পরিচালক বিউটি খাতুন দুবাই থেকে এসব লেনদেন পরিচালনা করেন।
রাফায়েত গ্রুপের চেয়ারম্যানের ফোন বন্ধ
রাফায়েত গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম–এর একাধিক নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সবগুলোই বন্ধ পাওয়া গেছে।
ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার জানান— প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। বড় একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন।
বন্ড আইন বলছে—‘বাজারে বিক্রি করলেই লাইসেন্স বাতিল’কিন্তু নীরব কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? কাস্টমস আইনে স্পষ্ট— বন্ড সুবিধার কাঁচামাল বাজারে বিক্রি করলে লাইসেন্স বাতিল–সঙ্গে ফৌজদারি ব্যবস্থা।
কিন্তু এখনো পর্যন্ত—
রাফায়েত ফেব্রিক্সের লাইসেন্স বাতিল হয়নি, কোনো বড় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি
মাসে মাসে চলেছে অনিয়মের বাণিজ্য
তথ্য বলছে, এ এক বছরের অনিয়মে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি শত কোটি টাকার ওপরে। প্রশ্ন উঠছে, এই চক্রের পেছনে কারা রয়েছে? সূত্র জানায়, বন্ড কমিশনারেট ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা সরাসরি লাভবান হয়েছেন।
দেশের বন্ড–ব্যবস্থার স্বচ্ছতা পুনরুদ্ধার করতে হলে, রাফায়েত গ্রুপ–কাস্টমস কর্মকর্তা–ইসলামপুর সিন্ডিকেট—এই ত্রিমুখী চক্র ভেঙে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।