সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিদেশি সম্পদ, ২৩ বস্তা নথি উদ্ধার
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও আরামিট গ্রুপের মালিক সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিপুল অবৈধ সম্পদের প্রমাণ–সম্বলিত ২৩ বস্তা নথি উদ্ধার করেছে। দুদকের দাবি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে মোট ৫৮২টি সম্পদের পাশাপাশি ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ক্যাম্বোডিয়াতেও তার অবৈধ সম্পত্তির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা ইউনিয়নের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে এসব নথি উদ্ধার হয়।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও পরবর্তী সময়ে ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ব্যবসায়িক পরিবার থেকে আসা এই রাজনীতিক আরামিট গ্রুপের মালিক হিসেবেও পরিচিত। রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি ব্যবসায়িক প্রভাব ব্যবহার করে দেশে–বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়েছেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল।
তবে এত বিপুল পরিমাণ নথি উদ্ধার হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় এলো।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধার করা নথিতে বিদেশে বাড়ি কেনা, ভাড়া থেকে আয়, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং অর্থ পাচারের (মানিলন্ডারিং) নানা প্রমাণ মিলেছে।
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ১৬ সেপ্টেম্বর কালুরঘাটে আরামিট গ্রুপের শিল্প কারখানা থেকে নথিগুলো সরিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান ইউসিবিএল ব্যাংকের চেয়ারম্যান রুকমীলা জামানের ড্রাইভার মো. ইলিয়াস তালুকদার। পরে ১৮ সেপ্টেম্বর দুদকের অভিযানের আগে বস্তাগুলো পাশের ওসমান নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে লুকানোর চেষ্টা হয়।
একজন দুদক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই নথি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হবে কীভাবে বিদেশে বাড়ি–বাড়ি সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। মানিলন্ডারিংয়ের একাধিক চেইনও উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
প্রশ্ন উঠছে—এত বিপুল সম্পদ গড়ে ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নীরব ছিল কেন? রাজনৈতিক প্রভাব কি এতটাই প্রবল ছিল যে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিষয়টি আড়াল করে রেখেছিল?
তথ্য বলছে, শুধু বিদেশেই নয়, দেশে জমি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমেও অস্বাভাবিক আর্থিক প্রবাহ ঘটেছে।
আইন বিশেষজ্ঞ রেজাউল করিম উদয়ের পথকে বলেন, বাংলাদেশের দুর্নীতির ইতিহাসে এত বড় আকারের নথি উদ্ধার নজিরবিহীন। এই নথি থেকে যদি যথাযথ তদন্ত হয়, তবে রাষ্ট্রের বিপুল সম্পদ পুনরুদ্ধার সম্ভব।
সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যবসায়ী সহযোগী দাবি করেছেন, নথির ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে দেওয়া যেতে পারে। সবকিছু অবৈধ নয়।
দুদকের উপপরিচালক সাংবাদিকদের বলেন, উদ্ধারকৃত নথির প্রাথমিক বিশ্লেষণ চলছে। মানিলন্ডারিং, কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে শিগগিরই মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক।
বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাসে এ ঘটনা এক নতুন অধ্যায়। বিপুল বিদেশি সম্পদ, মানিলন্ডারিংয়ের আলামত ও সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এ ধরনের সম্পদ সঞ্চয়ের ঘটনা আইন–শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্রও তুলে ধরছে।
এখনো অস্পষ্ট থেকে গেছে—আসলে মোট সম্পদের পরিমাণ কত, কারা এই নেটওয়ার্কে জড়িত, এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এত দিন বিষয়টি আড়াল করা হলো কীভাবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ নথির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ও বিচারিক পদক্ষেপ শুধু একটি বড় দুর্নীতি মামলার দিকনির্দেশই দেবে না, বরং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরুদ্ধারের পথও সুগম করতে পারে।