গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাংবাদিক মারিয়াম: ক্যামেরার লেন্সে যুদ্ধের গল্প বলা এক সাহসী কণ্ঠস্বরের বিদায়
বিশেষ প্রতিবেদক | জাহিদ সুমন
গতকাল ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় দক্ষিণ গাজার একটি হাসপাতালের সামনে কমপক্ষে ২০ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন পাঁচজন jসাংবাদিক, যাদের একজন—ফটোসাংবাদিক মারিয়াম আল-মাকদিসি।
প্রথম বিস্ফোরণে আহতদের সাহায্য করতে হাসপাতালে ছুটে যান উদ্ধারকর্মী ও সাংবাদিকরা। মাত্র ১৫ মিনিট পর আবারও সেই স্থানেই চালানো হয় দ্বিতীয় হামলা—একে মিডিয়া ও মানবিক কর্মীদের লক্ষ্য করে চালানো 'ডাবল ট্যাপ' অ্যাটাক বলে অভিযোগ করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
মারিয়ামের সহকর্মীরা জানিয়েছেন, এই আক্রমণ তাকে শেষ করে দিলেও থামাতে পারেনি তার সাহসিকতার উত্তরাধিকার। মারিয়াম আহত সহকর্মীর খোঁজে ছুটে গিয়েছিলেন আল-নাসের হাসপাতালে—যেখান থেকেই তিনি মাসের পর মাস গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বকে জানিয়ে এসেছেন।
শেষ ইচ্ছা ছিল—আমরা যেন না কাঁদি
২১ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক সামাহির ফারহান, মারিয়ামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, বলেন:
"তার শেষ ইচ্ছা ছিল, আমরা যেন তার বিদায়ের সময় কাঁদি না। ও চাইত আমরা ওর সঙ্গে কিছু সময় কাটাই, ওকে অনুভব করি।"
গাজার বহু সাংবাদিকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম ছিলেন মারিয়াম। অদম্য পরিশ্রম আর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে শ্রদ্ধা করতেন সবাই।
ভাইয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার পথচলা
২০১৮ সালে 'গ্রেট মার্চ অফ রিটার্ন' বিক্ষোভের সময় মারিয়ামের তোলা এক ছবিতে দেখা যায়, গুলি খাওয়া এক বিক্ষোভকারী ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। পরে তিনি জানতে পারেন, ওই যুবক ছিলেন তার আপন ভাই। সেই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি তাকে আরও সাহসী করে তোলে। এরপর থেকে তিনি গাজার যুদ্ধের চিত্র তুলেছেন ক্যামেরায়—জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
যুদ্ধকালেও থেমে যাননি
গত ২২ মাস ধরে চলমান গাজা যুদ্ধে মারিয়াম নিয়মিত প্রতিবেদন করে গেছেন। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেছেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও ইন্ডিপেনডেন্ট আরাবিয়া-র সঙ্গে।
ইন্ডিপেনডেন্ট আরাবিয়া তাকে আখ্যা দিয়েছে:
"অঙ্গীকার ও পেশাদারিত্বের উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি ক্যামেরা হাতে যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেই প্রবেশ করতেন।"
মানবিক গল্পের দ্যুতি তার ছবিতে
মারিয়ামের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে যুদ্ধের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলো।
এক ছবিতে দেখা যায়, পাঁচ বছর বয়সী জামাল আল-নাজ্জার অপুষ্টিতে মারা যাওয়ার পর তার নিথর দেহটিকে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে ইটের ওপর রাখা হয়েছে—মাটিতে যেন না ছোঁয়।
অন্য একটি ছবিতে শতাধিক মানুষ ত্রাণের ট্রাকের পেছনে দৌড়াচ্ছেন, খাদ্যের জন্য হাহাকার করছেন।
তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন, তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়ের, দয়ালু এবং দায়িত্বশীল। যুদ্ধের মধ্যেও তার সততা ও মানবিকতা ছিল অনন্য।
"একদিনের জন্যও থামেননি"
ফারহান বলেন,
"তিনি তার মা ও কাছের সহকর্মী আবু আনাসকে হারান, কিন্তু একদিনের জন্যও রিপোর্টিং বন্ধ করেননি।"
সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকাগুলো থেকেও রিপোর্টিং করতেন মারিয়াম। যদিও জানতেন—এটাই হতে পারে তার শেষ কাজ।
গাজায় সাংবাদিক হত্যার তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে
দ্য গার্ডিয়ানের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ গাজায় সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সময়। এখন পর্যন্ত ১৯২ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।
কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানালেও ইসরায়েলি বাহিনী বলেছে, “তারা সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না।”
ছেলের জন্য রেখে যাওয়া শেষ চিঠি
মারিয়ামের ছেলে গাইথ প্রায় দেড় বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাবার সঙ্গে অবস্থান করছে। ছেলেকে দেখার একান্ত আকাঙ্ক্ষা ছিল মারিয়ামের, যা অপূর্ণই থেকে গেল।
তবে গাইথের উদ্দেশ্যে রেখে যাওয়া একটি চিঠিতে মারিয়াম লিখেছিলেন:
"আমি চাই তুমি সফল হও, নিজেকে প্রমাণ করো এবং একজন বড় ব্যবসায়ী হও। যখন তুমি বড় হবে, বিয়ে করবে, আর তোমার একটি মেয়ে হবে—তার নাম রেখো আমার নামে, মরিয়াম। তুমি আমার ভালোবাসা, আমার হৃদয়, আমার ভরসা, আমার আত্মা—তুমি আমার গর্ব।"