অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Nov 11, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

পুরান ঢাকায় টার্গেট কিলিং — ফের জেগে উঠছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো দ্বন্দ্ব

নিজস্ব প্রতিবেদন |


পুরান ঢাকায় রোদেলা সকালেই গর্জে উঠল বন্দুক, আবারও আলোচনায় ইমন–মামুন বনাম জোসেফ গ্রুপের পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা


সোমবার, ১০ নভেম্বর সকাল ১১টা। রাজধানীর পুরান ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় মানুষজন তখন স্বাভাবিক দিনের মতোই ছুটে চলেছে। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফটকের সামনে হঠাৎই ছুটে আসে দুই মোটরসাইকেল আরোহী। মুখে কালো মাস্ক, হাতে ছোট পিস্তল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আদালত থেকে বেরিয়ে আসা এক ব্যক্তি—তারিক সাইফ মামুন—হঠাৎ দৌড়ে হাসপাতালে ঢোকার চেষ্টা করছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশ। পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ে দুই দুর্বৃত্ত, এরপর চোখের পলকে মোটরসাইকেলে চেপে অদৃশ্য হয়ে যায় তারা।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সব শেষ।ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের পরিচিত নাম ‘মামুন’ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।


সকাল ১০টার দিকে মামুন হাজিরা দিতে যান ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এ। মামলা—১৯৯৭ সালের মোহাম্মদপুরের পিসি কালচার হাউজিং এলাকার জাহিদ আমিন ওরফে হিমেল হত্যা। সে মামলার আরও পাঁচ আসামি—ওসমান, মাসুদ ওরফে নাজমুল, রতন, ইমন ও হেলাল।

সেদিন সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ছিল, কিন্তু কোনও সাক্ষী হাজির না হওয়ায় শুনানি পিছিয়ে দেওয়া হয় আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আদালত থেকে বেরিয়ে মামুন ন্যাশনাল মেডিক্যালে যান। সেখানে পৌঁছে ১০টা ৫১ মিনিটে ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার শেষ মুহূর্তগুলো। হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী  তখন ফটকের পাশে দায়িত্বে ছিলেন।
তিনি বলেন, দুই জন হঠাৎ মোটরসাইকেল থামিয়ে পিস্তল বের করে গুলি করে। একটি জানালায় লাগে, বাকিগুলো তার শরীরে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা চলে যায়।

রক্তাক্ত অবস্থায় মামুনকে প্রথমে ন্যাশনাল মেডিক্যালে নেওয়া হয়, পরে ঢাকা মেডিক্যালে স্থানান্তর করা হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।


সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই)  সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মৃতদেহে পাঁচটি গুলির চিহ্ন—মাথার নিচে একটি, বাম পিঠে একটি, বুকের ডান পাশে একটি, দুই হাতে দুটি।

এই হত্যাকাণ্ড হঠাৎ নয়—তথ্য বলছে, এটি ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলমান প্রতিশোধ রাজনীতির অংশ।
এক দশকের বেশি সময় ধরে চলছে ‘ইমন–মামুন’ ও ‘জোসেফ গ্রুপ’-এর দ্বন্দ্ব। সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যাকাণ্ড ও রাজধানীর চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয় এই সংঘর্ষের ইতিহাস। তখনই মুখোমুখি হয় দুই বলয়—ইমন–মামুন বাহিনী এবং জোসেফ গ্রুপ।


নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক থেকে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকা ছিল ‘ইমন–মামুন’ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা, টিপু হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলায় তাদের নাম উঠে আসে। কারাগারে দীর্ঘদিন একই সেলে কাটিয়েছেন তারা দুজনই।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তেজগাঁওয়ে মামুনকে লক্ষ্য করে চালানো হয় প্রথম বড় হামলা।
তখন তিনি বেঁচে গেলেও নিহত হন নিরপরাধ মোটরসাইকেলচালক ভুবন চন্দ্র শীল।
পুলিশের ধারণা—হামলার পেছনে ছিল ইমনের অনুসারীরা।
বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অবস্থান করছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।


অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধানের ভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফ বর্তমানে মালয়েশিয়ায়।
নব্বইয়ের দশকে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার উত্থান। ২০০৪ সালে ফ্রিডম পার্টির নেতা মোস্তফা হত্যা মামলায় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন, যা পরে যাবজ্জীবনে রূপান্তরিত হয়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় ২০১৮ সালে মুক্তি পেয়ে দেশ ছাড়েন তিনি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে,
জোসেফ বিদেশে বসে এখনো ঢাকার কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। টিপু হত্যার প্রতিশোধ নিতে মামুন দীর্ঘদিন তার টার্গেটে ছিলেন।


মামুন হত্যাকাণ্ডে মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছে ‘ইব্রাহিম গ্রুপ’ বলে দাবি করছে আন্ডারওয়ার্ল্ড–সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।
এই গ্রুপের নেতৃত্বে ইব্রাহিম, সানি, অনিক, পারভেজ, মাসুদ, নাজমুল, ভাইগ্না রনি ও কিলার কামাল। এই দলটি গত বছর থেকেই ইমন গ্রুপের হয়ে রাজধানীর ধানমন্ডি, কলাবাগান, রায়েরবাজার ও ট্যানারি পট্টিতে, চাঁদাবাজি চালাচ্ছে। ফ্ল্যাট, বাজার, আড়ত, এমনকি দোকানভাড়ার টাকাও যায় তাদের পকেটে। ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ খুলছেন না।


ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি)  বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে দুই হামলাকারীকে দেখা গেছে। তাদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। ব্যক্তিগত বিরোধ, আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্ব কিংবা আর্থিক লেনদেন—সব দিক বিবেচনায় তদন্ত চলছে।
তিনি আরও বলেন,
ঢাকায় পুরোনো গ্যাং–সংঘাত আবার মাথা তুলছে কি না, সেটাও আমরা নজর রাখছি।


তারিক সাইফ মামুন ২০ বছর কারাভোগের পর ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তি পান।
তিন মাস পরই তেজগাঁওয়ে তার ওপর হামলা হয়। তবু তিনি বেঁচে যান। কিন্তু এবার আদালত থেকে বেরিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই গুলিতে প্রাণ গেল তার।

এই হত্যাকাণ্ডের পর আবারও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরান ঢাকায়।
চাঁদাবাজি, খুন আর প্রতিশোধের ছায়া যেন ফের ফিরে এসেছে নব্বইয়ের দশকের সেই অন্ধকার সময়ের দিকে।


অপরাধ বিশ্লেষক ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা  বলেন, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড কখনো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর যখন শিথিল হয়, তখনই এই পুরোনো গ্যাংগুলো নতুনভাবে সংগঠিত হয়। মামুন হত্যাকাণ্ড সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত।
তিনি আরও বলেন,
যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়–প্রশ্রয় না বন্ধ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ধরনের টার্গেট কিলিংয়ের শেকড় শুকাবে না।

 প্রশ্ন উঠেছে : কে দেবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা?
পুরান ঢাকার মানুষ এখন আতঙ্কে—কোথা থেকে গুলি আসবে, কেউ জানে না। যে সন্ত্রাসী এক সময় আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভয়ঙ্কর মুখ ছিল, তিনিই এখন টার্গেট কিলিংয়ের শিকার। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং একটি সতর্ক সংকেত—ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের লুকানো অগ্নিগর্ভ বাস্তবতার।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডেটা ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ: দু’টি অধ্যাদেশ জারি

1

বাগেরহাটে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত সাংবাদিক

2

শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে প্রয়োজনে উপবৃত্তি বাড়ানো হবে: গ

3

বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিসার গ্র্যান্ড ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত

4

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নিয়ে বিভ্রান্তিকর খবর ‘ডাহা মিথ্যা’ — প্

5

৮ মাস পর ভারত থেকে এলো ১০০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ

6

সেনাপ্রধানের সঙ্গে তুরস্কের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

7

ইরানে প্রাচীন বিজয়ের স্মৃতিস্তম্ভ উন্মোচন, সমসাময়িক শত্রুর প

8

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য, বৈশ্বিক চ

9

সাত দিনের কর্মসূচি ঘোষণা বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে

10

মেহেরপুরে আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা

11

শ্রীবরদীতে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস পালিত

12

লন্ডনে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা সিজদা দিয়ে এসেছেন: হাসনাত আব্দুল

13

স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে সংস্কার কাজের নামে অনিয়মের অভিযোগ:নির্

14

গাজীপুরে সাংবাদিক হত্যায় ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

15

পহেলা বৈশাখে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধ

16

বিএনপির বিজয় ঠেকাতে নানা চেষ্টা চলছে — মন্তব্য তারেক রহমানে

17

২৪ লাখ ৬৭ হাজার কলিং ভিসার কোটা খুলেছে মালয়েশিয়া

18

রাতে পেট্রোল-অকটেন বিক্রি বন্ধের প্রস্তাব পাম্প মালিকদের

19

তদবির নয়, ভাগ্য নির্ধারণ করল কর্মস্থল —খুলনার বিভাগীয় কমিশনা

20