স্টাফ রিপোর্টার: খুলনা
তথ্য বলছে, খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, অবৈধ নিয়োগ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার জড়িত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিবোর্ডে সদস্য সচিব ও চেয়ারম্যানের পদ নিয়ে অবৈধ দখলদারিত্বের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সূত্র জানায়, এই কেলেঙ্কারির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিবিএ বিভাগের শিক্ষক শেখ মারুফুর রহমান এবং বোর্ডের দুই প্রভাবশালী সদস্য মোঃ মিজানুর রহমান ও সৈয়দ হাফিজুর রহমান।
অভিযোগ উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা পরিচালনায় নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে এই তিনজন পদচ্যুত, অবৈধ নিয়োগ এবং ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অনিয়মে যুক্ত। ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভিসি ও রেজিস্টারসহ ২০ জনকে বিনা কারণেই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, এবং তাদের স্থলে মিজান ও হাফিজের আত্মীয়দেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
একজন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা সাংবাদিককে জানিয়েছেন, “আমাদেরকে অনানুষ্ঠানিকভাবে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পরও কোনো প্রতিকার পাইনি। এ সবই নির্দেশিতভাবে পরিকল্পিত।
তথ্য বলছে, সৈয়দ হাফিজুর রহমান তার প্রাথমিক জীবনে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি আমজাদ নিকারির মাধ্যমে মাছ ব্যবসা দেখাশুনা করতেন। সূত্র জানায়, এখান থেকে বিপুল অর্থ অবৈধভাবে অর্জন করেছেন। এরপর খুলনার বড় বাজারে দালালি ব্যবসায় তিনি নিয়োজিত হন। মাত্র কয়েক মাসে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকার বিনিময়ে ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন, এমনকি বাড়ির কাজের লোকদেরও এই নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়নি।
শিক্ষক হওয়ার পরও ফাইনান্স ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে প্রফেসর আব্দুর রউফ বলেন, “ফাইনান্স ডিরেক্টর উপস্থিত না থাকার কারণে রেজিস্টার তাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব দিয়েছেন। বোর্ড কমিটি বৈধ কিনা প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার ড. এসকে শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, “কন্ট্রোলার ও রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়া হয়েছে। বোর্ডের সদস্যরা চুক্তিভিত্তিকভাবে নিয়োগ পেয়েছেন।” তবে তথ্য বলছে, ইউজিসি বহুবার মিটিংসহ অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন।
অভিযোগ উঠছে, মিজানুর রহমান অনুমোদিত অংশগ্রহণ ছাড়াই গোপন সভায় নিজেকে ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন। সাবেক চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে এই পদ গ্রহণ এবং কানাইলালকে ভারপ্রাপ্ত ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুতর। গোপন সূত্র জানায়, কানাইলাল প্রফেসর না হলেও ভিসির পদে বসেছেন।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, “উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিকতা ও সুশাসনের জন্য বড় হুমকি। ভুয়া ভাউচার, অবৈধ নিয়োগ এবং টাকার বিনিময়ে ক্ষমতা দখল শিক্ষার্থীদের অধিকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে।
ভুক্তভোগী শিক্ষকরা জানিয়েছেন, “নিয়ম অনুযায়ী ট্রাস্টিবোর্ডে সর্বাধিক ২১ জন সদস্য থাকতে পারে। বর্তমানে ১৮ জন সদস্য থাকায় তিনটি পদ পূরণের জন্য ৩০ জানুয়ারি মোঃ মিজানুর রহমান, হাফিজুর রহমান ও আজিজুল হকের নাম আরজেএসসিতে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও অনুমোদন মেলেনি।
তথ্য বলছে, গত ২১ মে মিজানুর রহমান অবৈধভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তখন লন্ডনে অবস্থানরত প্রফেসর ড. সিরাজুল হক চৌধুরী জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে ট্রাস্টি সংযোজন ও বিয়োজনের আবেদন দাখিল করেছিলেন। ৩ জুন অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করেন। তবে প্রশ্ন উঠছে, ৩০ জুন কিভাবে এজিএমে স্বাক্ষর সম্ভব হলো এবং ১ সেপ্টেম্বর জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে আবেদন দাখিল করা হলো?
অভিযোগ উঠছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টাদের সহায়তায় দুর্নীতির এই চক্র দীর্ঘ সময় ধরে চলছিল। প্রফেসর সিরাজুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, বিগত ১২ বছরের দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে চাইলে বাধা দিয়েছে খন্দকার বজলুল হক, নাহিদ নেওয়াজি ও ভগ্নিপতি রেজাউল আলম। এরা অবৈধ বিল ভাউচার ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছে।
তথ্য বলছে, সৈয়দ হাফিজুর রহমান সকাল থেকে রাত অবধি বিশ্ববিদ্যালয়ে অফিস করছেন, যা বিধি পরিপন্থী। মার্কেটিং-প্রমোশন খাতসহ বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ হরণে চেষ্টা অব্যাহত। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের টেন্ডার বাণিজ্য নিয়েও অনিয়ম রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকরা জানিয়েছেন, এই অবস্থায় শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নয়। প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে তাদের শিক্ষাগত পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা দাবি করছি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হোক।
বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ট্রাস্টিবোর্ডের অবৈধ দখল ও দুর্নীতি শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা হ্রাস করে। এটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দেশের উচ্চশিক্ষা মানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
তথ্য বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থিতিশীলতা ফেরানোর জন্য প্রয়োজন ট্রাস্টিবোর্ডের পুনর্গঠন, ইউজিসির সরাসরি হস্তক্ষেপ, এবং নিয়োগ ও অর্থ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা। পাশাপাশি, তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো দুর্নীতির ছবি উন্মোচন করতে হবে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, আমরা চাই যে প্রকৃত দোষীদের সনাক্ত করা হোক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজে বৈধ ও স্বচ্ছ প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হোক। ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা না হলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে।
সূত্র জানায়, ইতোমধ্যেই একাধিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরও কোনো প্রকার প্রতিকার মেলেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভাগ এবং ট্রাস্টিবোর্ডের প্রধানদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও ফোন রিসিভ করা হয়নি।
তথ্য বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি শুধু নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সমস্যা নয়, বরং দেশের উচ্চশিক্ষার মান ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য সতর্কবার্তা।
প্রকাশিত তথ্য, ভুক্তভোগীদের বর্ণনা, সূত্রের বিশ্লেষণ এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদন বলছে, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ট্রাস্টিবোর্ড কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি ব্যবস্থা দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি তুলছে।