তদবির নয়, ভাগ্য নির্ধারণ করল কর্মস্থল —খুলনার বিভাগীয় কমিশনার ফিরোজ।
স্টাফ রিপোর্টার | খুলনা
খুলনায় লটারির মাধ্যমে এসিল্যান্ড পদায়ন: তদবির ও সিন্ডিকেট ভাঙতে নতুন প্রশাসনিক ধারা।
খুলনা বিভাগে তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে ১৫ জন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি (ল্যান্ড)-এর পদায়নের ক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে কর্মস্থল নির্ধারণ করে ব্যতিক্রমী নজির স্থাপন করেছেন খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ ফিরোজ সরকার।
রবিবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ লটারি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে নতুন পদায়ন পাওয়া এসিল্যান্ডরাই নিজের হাতে কর্মস্থলের নাম টেনে বের করেন।
সূত্র জানায়, প্রশাসনের ইতিহাসে এমন উদ্যোগ অতীতে খুব বেশি দেখা যায়নি। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এসিল্যান্ড পদায়নে নানা পর্যায়ের তদবির, রাজনৈতিক সুপারিশ ও প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
“তদবির নয়, এবার ভাগ্য নির্ধারণ করবে কর্মস্থল” — কমিশনার ফিরোজ
অনুষ্ঠানে বিভাগীয় কমিশনার ফিরোজ সরকার বলেন,
“আমরা চাই মাঠ প্রশাসন আরও বেশি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হোক। পদায়নে তদবির ও প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে যোগ্য কর্মকর্তারা তাঁদের কর্মস্থলে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।”
তথ্য বলছে, এ লটারির মাধ্যমে ১৫ জন এসিল্যান্ডকে খুলনার বিভিন্ন উপজেলা ও উপজাতীয় এলাকায় পদায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি জায়গাকে ‘কঠিন পোস্টিং’ বা দূরবর্তী কর্মস্থল হিসেবে ধরা হয়, যা আগে অনেক ক্ষেত্রে ‘তদবির’ বা প্রভাব খাটিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হতো।
খুলনার প্রশাসনিক সূত্র জানায়, বিভাগীয় কমিশনার ফিরোজ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মাঠ প্রশাসনে সিন্ডিকেট ভাঙা, তদবির নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক উদ্যোগ নিয়ে আসছেন।
এর আগে ২১ জন সার্ভেয়ারের বদলিও তিনি একইভাবে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করে প্রশাসনিক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।
প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক পদায়নে প্রভাব ও লেনদেনের যে অভিযোগ চলে আসছিল — এই লটারি পদ্ধতি কি সেটিকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে পারবে?
একজন জ্যেষ্ঠ জেলা প্রশাসক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, এই পদ্ধতি যদি নিয়মিত করা যায়, তাহলে মাঠ প্রশাসনে অনেক পুরনো অনিয়ম বন্ধ হবে। তবে এটি এককালীন নয়, ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মাঠ প্রশাসনে এসিল্যান্ড বা উপজেলা পর্যায়ের ভূমি কর্মকর্তাদের পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় তদবির ও আর্থিক লেনদেন বহুদিনের গোপন বাস্তবতা। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা বা শহরতলীর পদগুলো পেতে হয় রাজনৈতিক পরিচিতি বা ‘তদবিরের’ মাধ্যমে।
তথ্য বলছে, গত এক দশকে এসব পদে অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে তদবির বা অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের অভিযোগ উঠে এসেছে।
একজন সাবেক যুগ্ম সচিব (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,মাঠ প্রশাসনের কিছু পদায়ন প্রক্রিয়ায় এমন পর্যায়ে তদবির ঢুকে গিয়েছিল যে, অনেক যোগ্য কর্মকর্তা ন্যায্যভাবে কর্মস্থল পাওয়ার সুযোগ হারাতেন। খুলনার এই উদ্যোগ যদি সারা দেশে অনুসরণ করা হয়, তাহলে এটি বড় ধরনের সংস্কার হিসেবে ধরা যাবে।
একজন তরুণ কর্মকর্তা, যিনি আগে পদায়নে তদবিরের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন, বলেন-
আগে নির্দিষ্ট এলাকায় পোস্টিং পাওয়ার জন্য সিন্ডিকেট বা ‘উচ্চপর্যায়ের’ সুপারিশ লাগত। কিন্তু এবার ভাগ্যই আমাদের কর্মস্থল ঠিক করেছে। এতে একধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, যোগ্যতা ও কর্মফল দিয়েই নিজের অবস্থান তৈরি করা যাবে।
আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, তদবির ও সুপারিশের ভয়ে কেউ কেউ ‘কঠিন পোস্টিং’-এর ভয়ে থাকতেন। এখন সেই ভয়ও অনেকটা কেটে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের লটারিভিত্তিক পদায়ন একটি ‘ট্রান্সপারেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মডেল’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, পদায়নে তদবির ও আর্থিক লেনদেন বন্ধ করা গেলে প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতির একটি বড় উৎসই বন্ধ হয়ে যাবে। খুলনার এই মডেল সারা দেশে অনুসরণ করা হলে এটি এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হতে পারে।
প্রশ্ন উঠছে, কেন্দ্রীয় প্রশাসন এই মডেলটি কতটা গুরুত্ব দিয়ে নেবে এবং অন্যান্য বিভাগে প্রয়োগ করবে কি না।
উপস্থিত সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের প্রশংসা, পদায়ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খুলনা প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হক ও সদস্যসচিব রাফিউল ইসলাম টুটুলসহ স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা।
তারা লটারির এই পদ্ধতিকে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেছেন।
“আমরা দীর্ঘদিন ধরে পদায়নে অস্বচ্ছতা নিয়ে রিপোর্ট করে আসছি। আজকের এই উদ্যোগ মাঠ প্রশাসনে আস্থার জায়গা তৈরি করবে,— বলেন খুলনা প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হক।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে এসিল্যান্ড পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি ব্যবস্থাপনা, খাস জমির হস্তান্তর, কৃষি খতিয়ান সংরক্ষণ, মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়সহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এই কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল।
তথ্য বলছে, বর্তমানে সারা দেশে এসিল্যান্ড কর্মরত আছেন। প্রতি বছর গড়ে ৩০-৫০ জন নতুন কর্মকর্তা পদায়ন পান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যদি খুলনার মতো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ভূমি অফিস সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ও তদবির কমে আসবে, বাড়বে জনআস্থা।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ ফিরোজ সরকারের এই লটারিভিত্তিক পদায়নকে অনেকেই দেখছেন প্রশাসনে ‘তদবিরমুক্ত একটি নতুন ধারা’ হিসেবে। তবে এই ধারা টিকিয়ে রাখতে ধারাবাহিকতা, কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সহযোগিতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রশ্ন এখন — এই মডেল কি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে? নাকি খুলনার সীমানাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?