নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলায় একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে— “যে লাউ সে কদু।” জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান পরিস্থিতিকেই অনেক কর্মকর্তা এই প্রবাদ দিয়ে উপমা দিচ্ছেন। সচিব পদে বহুল আলোচিত ড. মোখলেস-উর-রহমানকে সরিয়ে এনে মো. এহছানুল হককে সিনিয়র সচিব নিয়োগ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি—বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত ও নিগৃহীত কর্মকর্তাদের যথাযথ স্বীকৃতি এখনো নিশ্চিত হয়নি; অন্যদিকে রাজনৈতিক ছায়াতলে থাকা সুবিধাভোগীরা—যাদের একটি অংশকে প্রশাসনে এখন “জামায়াত লীগ” নামে অভিহিত করা হচ্ছে—তারা অধিক সুবিধা পাচ্ছেন। ডিসি পদে সাম্প্রতিক পদায়নকে কেন্দ্র করে নতুন সচিবকে ঘিরে বড় ধরনের কেলেঙ্কারির জন্ম হয়েছে বলেও অভিযোগ।
গত অক্টোবর মাসে বিএনপিসহ কয়েকটি মহলের অভিযোগ ছিল—জনপ্রশাসন “জামায়াতের এজেন্ডা” দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সচিব পরিবর্তনের নির্দেশ দেন।
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়—প্রধান উপদেষ্টা যাকে সচিব করতে চেয়েছিলেন, সেই প্রস্তাব আটকে দেয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ ও উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নেতৃত্বে আরেক গ্রুপ।
কয়েকদিনের দেনদরবারের পর এহছানুল হককে সচিব নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
পদায়ন–পদোন্নতি, বিশেষ করে ডিসি নিয়োগ ও এপিডি উইং পরিচালনায় নতুন সচিব আগের বিতর্কিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। সচিব নিয়োগের তিন দিনের মাথায় চার জেলায় ডিসি পরিবর্তন হয়। অভিযোগ উঠে—এদের সবাই ছিলেন আওয়ামীপন্থি সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সচিব এহছানুল হক দায় অস্বীকার করেন।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—
প্রজ্ঞাপন তো তাঁর হাত দিয়েই জারি হয়েছে। চাইলে তিনি আপত্তি তুলতে পারতেন—তবে তা করেননি কেন?
দীর্ঘ ১৫ বছর আওয়ামী লীগ আমলে যারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন—তাদের পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।কিন্তু সংশ্লিষ্টদের দাবি—সচিব পরিবর্তনের পরও তাদের ভাগ্য বদলায়নি।
নতুন সচিবের অফিসেও আওয়ামীপন্থি ও জামায়াতপন্থি সুবিধাভোগী গ্রুপ প্রভাব বজায় রেখেছে।
পদোন্নতি প্রত্যাশী কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়া হচ্ছে।কর্মকর্তাদের “রিপোর্ট ভালো নয়”—এই যুক্তি দেখিয়ে পদোন্নতি আটকে রাখা হচ্ছে; তবে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেখানো হয়নি।
একজন ভুক্তভোগী বলেন-আমরা যখন রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার ছিলাম, তখনো পদোন্নতি পাইনি। এখনো পাচ্ছি না। মাঝে শুধু সচিব বদল হয়েছে—বঞ্চনা একই আছে।
সচিব এহছানুল হক এর আগেও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে সিনিয়র সচিব থাকাকালে বহু সাধারণ নথি আটকে রাখার অভিযোগ ছিল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও এখন—ছুটি-ছাটা,পেনশন,ভুতাপেক্ষ পদোন্নতি,
সাধারণ বদলি-পদায়ন—এসব নথির শত শত ফাইল আটকে আছে। সূত্র জানায়,নথিপত্র সচিবের টেবিলে জমে থাকে। সিদ্ধান্ত আসে দেরিতে, আবার অনেক সিদ্ধান্ত আসে অন্য ব্যক্তিদের ‘ইঙ্গিত’ অনুসারে।
পরিবর্তনের বদলে অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ সাধারণ ধারণা ছিল—বহুল বিতর্কিত এপিডি উইং পুরোপুরি বদলে দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো— উইংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেউই পরিবর্তিত হয়নি। আওয়ামী আমলের কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তা এখনও বহাল।নতুন যুক্ত হওয়া কর্মকর্তাদের একটি অংশ জামায়াতঘেঁষা বলে অভিযোগ।
অতিরিক্ত সচিব এপিডি পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রাখা হয়েছে কৌশলে। ঘোষণা করা হয়—
“সচিব নিজেই অতিরিক্ত সচিব এপিডির কাজ করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—অঘোষিত ক্ষমতাধর ব্যক্তি: যুগ্মসচিব মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী
তাকে নিয়ে অভিযোগ—আওয়ামী আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।বর্তমান পরিস্থিতিতে আবার প্রভাবশালী হয়ে ওঠেছেন। সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে পদোন্নতি–পদায়নের ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
সূত্রের ভাষায়—ফরিদী এখন ঘোষণা না থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত সচিব এপিডির মতো আচরণ করছেন।
ক্ষমতার অদৃশ্য কেন্দ্র,অনুসন্ধানে উঠে এসেছে অফিসার্স ক্লাবকে কেন্দ্র করে একটি ধারাবাহিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কথা। এই গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন—এ বি এম আব্দুস সাত্তার,বর্তমান সাধারণ সম্পাদক (নির্বাচন ছাড়াই বহাল) বগুড়া/গুলশান লাইনঘেঁষা প্রভাবশালী মহল। অভিযোগ—গোপনে তদবির বাণিজ্য,পদোন্নতি–পদায়ন “ম্যানেজ” করা,বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সচিবদের থেকে অর্থ আদায়,হাজার কোটি টাকার মতো লেনদেন বিদেশে পাচারের অভিযোগও আছে,প্রশাসনে বিএনপি নামধারী হলেও বাস্তবে জামায়াতঘেঁষা কর্মকাণ্ড।
১৪ আগস্ট ২০২৪ সালে সচিবালয়ে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের হাতে ধাওয়া খাওয়ার ঘটনাটিও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।এক কর্মকর্তা বলেন:এই সিন্ডিকেটের কারণে প্রকৃত বিএনপিপন্থি কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত। তারা নিজেদের স্বার্থে যেকোনো পক্ষের হয়ে কাজ করে।
জনপ্রশাসন কীভাবে চলছে এখন?
একজন কর্মকর্তার ভাষায়—এখন প্রশাসন চলছে চারজনের সমন্বয়ে: এহছানুল হক, ড. শেখ রশীদ, এ বি এম আব্দুস সাত্তার ও ফরিদী—এদের প্রভাবেই সব সিদ্ধান্ত হয়।অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে—নানা ক্যাডারের পদোন্নতি, বিশেষ করে স্বাস্থ্য ক্যাডারের ফাইল অগ্রাধিকার পাচ্ছে।নির্দেশনা আসছে অফিসার্স ক্লাব থেকে।
বদলি, পোস্টিং, প্রেষণ—সবকিছুতে অনিয়ম ও তদবির সক্রিয়।
একজন সাবেক সচিব মন্তব্য করেন,প্রশাসনকে স্বচ্ছ করতে যে পরিবর্তন আনার কথা ছিল, তা হয়নি। বরং একাধিক সিন্ডিকেট নতুন করে মাথা তুলেছে। জনপ্রশাসন সচিব পরিবর্তন করা হলেও মন্ত্রণালয়ের মৌলিক সমস্যাগুলো রয়ে গেছে—নথি দীর্ঘদিন আটকে থাকা,বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি না হওয়া, রাজনৈতিক পক্ষপাত,অঘোষিত প্রশাসনিক সিন্ডিকেট, প্রভাবশালী কর্মকর্তা–কর্মচারীদের দৌরাত্ম্য, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্বচ্ছতা।
অভিযোগ উঠছে—একদিকে প্রধান উপদেষ্টা জনপ্রশাসনকে নিরপেক্ষ করতে চাইছেন, অন্যদিকে বিভিন্ন অঘোষিত গ্রুপ নিজেদের স্বার্থে প্রশাসনকে ব্যবহার করছে।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন:
“গোড়া থেকে স্বচ্ছ সংস্কার ছাড়া প্রশাসন বদলানো সম্ভব নয়। সচিব পরিবর্তনে কাঙ্ক্ষিত সমাধান আসেনি—বরং নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।