রাজধানীর সীসাবার: অবৈধ ব্যবসা, প্রশাসনের সীমিত পদক্ষেপ ও তরুণ প্রজন্মের ঝুঁকি
জাহিদ সুমন
তথ্য বলছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকায়, বিশেষ করে খিলক্ষেত, বনানী, গুলশান ও বারিধারা এলাকায় নিয়মিত সীসা আসর ও অবৈধ বার চলমান। ভুক্তভোগী অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে, এই বাণিজ্য প্রকাশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনের সীমিত নজরদারি থাকলেও মূল হোতারা কোনো বাধা ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, ঢাকা রিজেন্সী হোটেলসহ অন্তত ৮৬টি সীসাবার রয়েছে, যেখানে রাতের গভীর অন্ধকারে তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি বেশি। এসব স্থানে শুধু ফ্লেভারযুক্ত সীসা নয়, ব্যবহার হচ্ছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা এবং এলকোহল।
ভুক্তভোগী অভিভাবকরা অভিযোগ করছেন, আমাদের সন্তানরা প্রতিনিয়ত এসব স্থানে যাতায়াত করছে। অ্যালকোহল, মাদক ও সীসার ধোঁয়া মিলিয়ে পরিবেশ অশান্ত ও বিপজ্জনক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অব্যাহত নজরদারি না করায় মাদক ব্যবসায়ীরা আরেক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থী এক ভুক্তভোগী বলেন, সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আড়ালে-আবডালে যেসব লাউঞ্জ খোলা থাকে, সেখানেই আমাদের বন্ধুরা নিয়মিত যাওয়া শুরু করেছে। পারিবারিক কলহ, স্কুলে অনুপস্থিতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়।
স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে, পুলিশ ও থানা কর্তৃপক্ষের কিছু কর্মকর্তা ফ্রি খেয়ে বা মাসোহারা নিয়ে সীসাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অনেকে শর্ত দিয়েছেন, হানা দেওয়া হবে না, অভিযানের প্রতিবন্ধকতা হবে না।
তথ্য বলছে, রাজধানীর সীসাবারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:১. গুলাইশান-২, ১১২ রোড: দ্য কোর্টইয়ার্ড বাজার।
২.বনানী, ১১ নং রোড: থার্টি টু ডিগ্রি লাউঞ্জ।
৩. বানানী, পাশের কিউডিএস লাউঞ্জ।
৪.গুলাইশান-২, ১০১ এভিনিউ: মনতানা লাউঞ্জ।
৫. বনানী, ৭ নং রোড: ক্লাব ৯২৯৪।
৬. ইউনিক রিজেন্সী হোটেল, রুফটপ স্কাই রেস্টুরেন্ট।
৭. বারিধারা রোড: নেক্সাস ক্যাফে প্যালেস।
৮. ধানমন্ডি, মিরপুর,
বনানী ১১ নম্বর রোডে সেলসিয়াস, এক্সোটিক, কিউডিএস, সিগনেচার, অরা, ৩৬০ ডিগ্রি, আরগেলা, ৩২ ডিগ্রি, সিলভার, গ্রিসিনো, মারবেলা, হাবিবি, এক্সাইল, হেইগ, হবনব নামে আরও প্রায় ১৫টি সিসা লাউঞ্জের খোঁজ পাওয়া গেছে। বনানীর পাশাপাশি প্রায় প্রকাশ্যেই গুলশান এলাকায় ‘মন্টানা’ ও ‘কর্টিয়র বাজার’ নামে দুটি সিসা লাউঞ্জ রয়েছে।
মোহাম্মদপুর রয়েছে কয়েকটি লাউঞ্জ।
তথ্য বলছে, এসব সীসাবারে শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, চাকরিজীবী ও অভিজাত ব্যক্তিরা নিয়মিত উপস্থিত থাকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক জানিয়েছেন, সীসার ফ্লেভার অনুযায়ী নিকোটিনের পরিমাণ ০.২ শতাংশের বেশি হলে এটি খ শ্রেণির মাদক হিসেবে গণ্য হয়। আইন অনুযায়ী, এমন মাদকদ্রব্যের ব্যাবহার, সংরক্ষণ এবং বিক্রি দণ্ডনীয়। কিন্তু রাজধানীর বেশিরভাগ লাউঞ্জে নিকোটিন ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত। এই কারণে আইন অমান্য করে ব্যবসা চালানো হচ্ছে।
তথ্য বলছে, ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) কার্যালয়ের নাম না বলা শর্তে জানিয়েছেন, “সীসায় ব্যবহৃত ভেষজ নির্যাস, এসেন্স ও ক্যারামেল মিশ্রিত করা হয়। যেসব লাউঞ্জে এগুলো সরবরাহ করা হয়, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি ও বয়সসীমা মানা হয় না। আইন স্পষ্ট হলেও কার্যকর নজরদারি নেই।
তথ্য বলছে, সীসাবারের উপস্থিতি যুবসমাজের মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।
স্কুল-কলেজে অনুপস্থিতি ও পড়াশোনায় ব্যাঘাত।
অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি, যেমন চুরি ও ছিনতাই।
ভুক্তভোগী অভিভাবকরা বলছেন, নিয়মিত অভিযান হলেও মালিকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে ব্যবসা চালিয়ে যান। সামাজিক সচেতনতা ছাড়া আইনশৃঙ্খলার একা পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।
তথ্য বলছে, সৌদি আরব, কাতার ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সীসা ক্যাফে বৈধ হলেও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। লাইসেন্স ছাড়া সেবন বা বিক্রি হলে ফৌজদারি মামলা হয়। স্বাস্থ্যবিধি মানা বাধ্যতামূলক, ১৮ বছরের নিচে প্রবেশ নিষিদ্ধ। স্কুল, পার্ক, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার কাছাকাছি সীসা সরবরাহে জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা থাকে।
তথ্য বলছে, বাংলাদেশে এমন কোনো কাঠামো নেই। লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ নেই, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বয়সসীমা মানা হয় না। ফলে সীসাবারের বিস্তার নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জানিয়েছেন, ঢাকায় বৈধ কোনো সীসাবার নেই। সব ব্যবসা অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বনানীতে ‘৩৬০ ডিগ্রি’ সীসাবারে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে এটি যুক্ত।
তথ্য বলছে, অভিযান চালিয়ে ডিএনসির রাসায়নিক পরীক্ষাগারে জব্দ উপাদান পরীক্ষা করা হয়। যেখানে নিকোটিনের পরিমাণ ০.২ শতাংশের বেশি পাওয়া যায়, সেখানে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ওপেন সিক্রেট। সবাই জানে, প্রশাসন ও পুলিশ দেখেও ধরছে না। দিন দিন এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সীসা খ শ্রেণির মাদক, যা ফ্লেভারসহ ইয়াবা ও ফেনসিডিলের সংমিশ্রণে তরুণদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
তথ্য বলছে, সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র অভিযান নয়। প্রয়োজন
অবৈধ সীসাবারের সিলগালা ও সরঞ্জাম জব্দ।মূল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা।
স্কুল-কলেজে সচেতনতা কার্যক্রম।
স্বাস্থ্যবিধি ও বয়সসীমা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো।মিডিয়া ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনসচেতনতা।
ভুক্তভোগী অভিভাবকরা বলছেন, নিয়মিত অভিযান হলেও মালিকরা ধরে ছাড়ে না। কার্যকর নজরদারি না হলে এক প্রজন্ম নেশার জালে ফেলে দেওয়া হবে।
তথ্য বলছে, রাজধানীর সীসাবারগুলোর কার্যক্রম অবৈধ ও নিয়ন্ত্রণহীন। প্রশাসন সীমিত পদক্ষেপ নিচ্ছে, কিন্তু মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। না হলে আগামী প্রজন্ম মাদকসেবনের ভয়াবহ প্রভাবের সম্মুখীন হবে।