অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Nov 7, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

নয় মাসে ৮৩ কোটি টাকার ব্যয়—কোথায় গেল এই অর্থ?


বিশেষ অনুসন্ধান প্রতিবেদন | 

নতুন প্রশ্নের জন্ম, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র নয় মাস পর হঠাৎ দেশত্যাগ করেছেন ড. আলী রীয়াজ। এই প্রস্থান ঘিরে এখন নানা প্রশ্ন—৮৩ কোটি টাকার ব্যয়, অগ্রগতি বিহীন কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার অভাব, এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার সংকট।

প্রশ্ন উঠছে—নয় মাসে এত বিপুল অর্থ খরচ হলো কোথায়, আর কেনই বা পদত্যাগ না করেই চুপিসারে দেশ ছাড়লেন কমিশনের অন্যতম মুখ্য ব্যক্তিত্ব?

তথ্য বলছে, বাজেটের ৭৮ শতাংশই প্রশাসনিক খাতে, সরকারি ও কমিশন-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই ৮৩ কোটি টাকার প্রায় ৭৮ শতাংশই ব্যয় হয়েছে প্রশাসনিক ও পরামর্শমূলক খাতে—যার মধ্যে রয়েছে ভ্রমণ, বিদেশ সফর, ও কর্মশালার ব্যয়। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও নীতিগত ঐকমত্য গঠন; কিন্তু সূত্র জানায়, সেই সংলাপের জন্য নির্ধারিত রাজনৈতিক ফোরাম বা,পরামর্শ সভা,র অধিকাংশই কখনো অনুষ্ঠিত হয়নি।

অভিযোগ উঠছে, বাজেটের একটি বড় অংশ গেছে,গবেষণা উপকরণ, ও তথ্যসংগ্রহ জরিপ, নামে কাগুজে প্রকল্পে, যেখানে প্রকৃত কোনো মাঠ জরিপ বা স্বাধীন গবেষক অংশ নেননি।

মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের মন্তব্য,  পুরোহিতও নাই, মাঠও নাই
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও সাবেক ছাত্রনেতা মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর সাম্প্রতিক এক টকশোতে প্রশ্ন তোলেন—

নয় মাসে ৮৩ কোটি টাকা খরচ করলেন, তারপর বললেন—রাজনৈতিক দলগুলো এখন সিদ্ধান্ত নিক। তাহলে শুরুতেই বললেন না কেন? এতদিন মাঠ ছিল, পুরোহিত ছিল আলী রীয়াজ ড. ইউনূসের পক্ষে।

তিনি আরও বলেন, আপনি নয় মাস কাটালেন হজপজ, বুকিশ কাজকারবার করে। দেশের অর্থনীতি নাজুক, নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভঙ্গুর—এমন সময়ে জনগণ চায় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ, বিদেশি কনসালটেন্সি নয়। তার এই বক্তব্যের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।

সূত্র জানায়, কমিশনের ব্যয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড. আলী রীয়াজ ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বিদেশি পরামর্শককে যুক্ত করে উচ্চ পরিমাণ পারিশ্রমিক নির্ধারণ করেছিলেন, যা সরকারি প্রকল্পের প্রচলিত মানদণ্ডের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।
একজন সাবেক সদস্য বলেন,

একটি সেমিনারে কফি, কুকিজ ও ব্যানার প্রিন্টিংয়ের জন্য তিন লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। অথচ সেই সভা ভার্চুয়ালভাবে হয়েছিল।

দুদকের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র বলছে, কমিশনের আর্থিক নথি ইতিমধ্যে পর্যালোচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে,অতিরিক্ত ব্যয় ও অনুমোদনবিহীন ভ্রমণ, সম্পর্কিত কিছু অসঙ্গতি চিহ্নিত করা হয়েছে।

দুদকের অবস্থান, প্রাথমিক নজরদারি শুরু, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানিয়েছে, এই ব্যয়ের অডিট ও অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে নজরদারি ও তথ্যসংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন,

এটি সরাসরি তদন্ত নয়, তবে অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেলে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান শুরু হবে।

তিনি আরও জানান, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিদেশ সফর, দ্বৈত পেমেন্ট বা ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান থেকে কনসালটেন্সি নেওয়া হলে তা স্বার্থের সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রশ্ন উঠছে: ড. ইউনূসের ভূমিকা কী ছিল? ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠনের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে এটি নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই কমিশনের সহসভাপতির দেশত্যাগ ও আর্থিক অস্বচ্ছতা পুরো কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. ইউনূসের টিমে আলী রীয়াজ ছিলেন মূল নীতিনির্ধারক—তিনি নীতি প্রণয়ন, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দায়িত্বে ছিলেন। এখন তিনি চলে যাওয়ায় কমিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। একজন সাবেক আমলা বলেন,

৮৩ কোটি টাকার প্রকল্পে যদি মূল কৌশল নির্ধারণকারী চলে যান, তাহলে প্রকল্পের বৈধতা ও জবাবদিহিতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।


তথ্য বলছে, কমিশনের অগ্রগতি প্রায় শূন্য, সরকারি অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, নয় মাসে কমিশনের কার্যক্রম হিসেবে মাত্র দুটি প্রকাশ্য সভা, তিনটি নীতিপত্র খসড়া, ও একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। অথচ বাজেটে বলা ছিল—অন্তত ১২টি আঞ্চলিক পরামর্শ সভা,ও,ছয়টি নীতিগত গবেষণা, করা হবে। 
অভিযোগ উঠছে, এসব সভার বেশিরভাগই হয়েছে ঢাকায়, এবং একই অংশগ্রহণকারীদের দিয়ে কৃত্রিমভাবে উপস্থিতি দেখানো হয়েছে।
একজন অর্থনীতিবিদ বলেন,

এটি কার্যত একটি পরামর্শক-চালিত প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। মাঠের জনগণের অংশগ্রহণ ছিল নামমাত্র।


 প্রশাসনিক জবাবদিহি অনুপস্থিত
অর্থনীতিবিদ ড. রুবাইয়াত হোসেন বলেন, ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে যদি বাস্তব ফলাফল দেখা না যায়, তাহলে এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা। প্রকল্পে জবাবদিহি না থাকলে অনিয়মের সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়।

নীতিশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ড. জয়া মিত্র বলেন,
গণতান্ত্রিক ঐকমত্যের নামে যদি রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক স্বার্থের সংঘাত ঘটে, তাহলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে। এই কমিশনের মূল লক্ষ্যই ছিল জনআস্থা পুনর্গঠন, কিন্তু এখন সেটিই প্রশ্নবিদ্ধ।


ভুক্তভোগীদের প্রতিক্রিয়া: হতাশ নাগরিক ও নিরাশ তরুণ সমাজ
কমিশনের সাথে যুক্ত তরুণ গবেষক তানিয়া সুলতানা বলেন,

আমরা ভেবেছিলাম নতুন প্রজন্মের জন্য একটা নীতি আসবে। কিন্তু এখন দেখি সবই ফাইল আর পরামর্শকের ঘরে বন্দি।

ঢাকার বাইরে একাধিক নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি বলেন, “আমাদের কাউকে ডাকা হয়নি, সংলাপের কথা শুনেছি টিভিতে।
জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় অনেকেই বলছেন—এই প্রকল্প শুধু সরকারি তহবিল ব্যয়ের নতুন রূপ, যা উন্নয়নের নামে পরামর্শ শিল্প-এ পরিণত হয়েছে।

 আস্থার সংকট গভীর হচ্ছে, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এমন সময়ে যখন দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজন, তখন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ব্যর্থতা একটি নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে।

একজন সাবেক সচিব বলেন,
আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা এখন প্রশ্ন তুলছে—এই অর্থব্যয় কি জনগণের উন্নয়নে নাকি ব্যক্তিগত প্রচারণায়?


সূত্র জানায়,  বিদেশে যাওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ নথি সরানো হয়, প্রশাসনিক একটি সূত্র দাবি করেছে, আলী রীয়াজ দেশ ছাড়ার আগে অফিস থেকে কিছু ডিজিটাল ফাইল ও নোটস মুছে ফেলেন। ওই নথিতে ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও অনুমোদনের প্রমাণ ছিল বলে অভিযোগ।

তবে কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান কার্যালয় বলছে, সব নথি নিরাপদে আছে এবং প্রয়োজনে তা দুদক বা হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কাছে প্রদান করা হবে।

করদাতার টাকার জবাব কোথায়?
৮৩ কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব থেকে ব্যয় হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—এই অর্থের সুফল কতটুকু জনগণ পেয়েছে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের ব্যর্থ প্রকল্প শুধু করদাতার অর্থ অপচয় নয়, বরং রাজনৈতিক আস্থার ক্ষতিও বয়ে আনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন,

এই প্রকল্পের আওতায় খরচের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা থাকা উচিত ছিল। এখন অডিট শুরু হলেও প্রকৃত ব্যয়ের পথ অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।


 জবাবদিহিতার অপেক্ষায় জাতি, ড. আলী রীয়াজের আকস্মিক প্রস্থান ও ৮৩ কোটি টাকার ব্যয় নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা এখন আর কেবল ব্যক্তিগত নয়—এটি রাষ্ট্রীয় আর্থিক জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
দুদক ইতিমধ্যে প্রাথমিক নজরদারি শুরু করেছে, এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ও অডিট রিপোর্ট তলব করেছে বলে সূত্র জানায়।
তবে জনগণের প্রশ্ন এখনো জোরালো—

নয় মাসে ৮৩ কোটি টাকা কোথায় গেল?
কেন শুরুতেই বলা হলো না যে রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত নেবে?
এখন এই অর্থের দায়ভার নেবে কে?

এই প্রশ্নের উত্তরই এখন জাতির প্রত্যাশা—একটি নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা।

জনগণের করের টাকায় চলা প্রতিটি প্রকল্পই জনস্বার্থের দায়বদ্ধতা বহন করে। ড. আলী রীয়াজের ৮৩ কোটি টাকার প্রকল্প এখন সেই দায়বদ্ধতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ—যার উত্তর না মিললে আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খাগড়াছড়িতে সহিংসতার ঘটনায় তিন মামলা, আসামি হাজারের বেশি

1

পঞ্চগড়ে দুদকের গণশুনানি আগামীকাল

2

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ব্যয় নিয়ে তোলা অভিযোগ ভিত্তিহীন: কমিশনে

3

উখিয়া বিজিবি’র হাতে ১০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার।

4

খুলনা জেলা বিএনপিতে নেতৃত্বে অস্থায়ী পরিবর্তন

5

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

6

সন্দেহজনক হামে’ আরও ১০ শিশুর মৃত্যু, বেশি ঢাকায়

7

রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন সম্পন্ন

8

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নিয়ে বিভ্রান্তিকর খবর ‘ডাহা মিথ্যা’ — প্

9

অবৈধ এমডির দখলে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, নিশ্চুপ বাংলাদেশ ব্যাং

10

কাজের মান নিয়ে বিরোধে প্রকৌশলীকে ধাওয়া

11

বুয়েট শিক্ষার্থীদের পদযাত্রা ঠেকাতে গিয়ে সংঘর্ষ, আহত ৮ পুলিশ

12

দখল, দূষণে বিপর্যস্ত খুলনার প্রাণরেখা ভৈরব নদ

13

আরো ১৬টি দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থাকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত ই

14

কৃষকের ছদ্মবেশে গ্রেপ্তার ডাকাতি মামলার আসামি

15

অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, অনিশ্চয়তায় ৯২ এ

16

প্রথমবারের মতো দুদকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির

17

সুন্দরবনে নিখোঁজ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড

18

শাহবাগ ও ঢাবি মেট্রো স্টেশন মঙ্গলবার বন্ধ থাকবে

19

হবিগঞ্জে ৫৩ কেজি গাঁজাসহ ২ জন আটক

20